বিকাশের বিভিন্ন দিক (Aspects of Development): কোহলবার্গের তত্ত্ব (Views of Kohlberg)
Physical, Social, Emotional, Language and Cognitive development; Views of Kohlberg for CTET/WBTET in Bengali
Published by: TET Sampan Editorial Team
আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী লরেন্স কোহলবার্গ (Lawrence Kohlberg) মানুষের নৈতিক বিচারবুদ্ধির বিকাশ নিয়ে একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রকাশ করেন, যা "নৈতিক বিকাশ (Moral Development) তত্ত্ব" (Moral Development Theory) নামে পরিচিত。 জঁ পিয়াজের জ্ঞানীয় বিকাশ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে কোহলবার্গ তাঁর এই গবেষণাটি চালিয়েছিলেন。
কোহলবার্গ বিভিন্ন বয়সের শিশুদের সামনে কিছু জটিল নৈতিক দ্বন্দ্ব (Moral Dilemma) বা কাল্পনিক গল্প উপস্থাপন করতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি হলো 'হাইনজের দ্বিধা' (Heinz Dilemma)।
> হাইনজের দ্বিধা (Heinz Dilemma): হাইনজের স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর মুখে। একটি নির্দিষ্ট ওষুধই কেবল তাঁকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু স্থানীয় এক ওষুধ ব্যবসায়ী (Druggist) সেটি তৈরি করতে যা খরচ হয়েছে তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি দাম চাইছেন। হাইনজ সব জায়গা থেকে টাকা ধার করেও ওষুধের দামের অর্ধেক মাত্র জোগাড় করতে পারলেন। তিনি ব্যবসায়ীকে অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও সে কম দামে ওষুধ দিতে বা পরে বাকি টাকা নিতে রাজি হলো না। নিরুপায় হয়ে স্ত্রীকে বাঁচাতে হাইনজ রাতে ওই দোকান ভেঙে ওষুধটি চুরি করলেন।
কোহলবার্গ শিশুদের এই গল্পটি শুনিয়ে প্রশ্ন করতেন: হাইনজ যা করেছেন তা কি ঠিক না ভুল? এবং কেন ঠিক বা ভুল? শিশুরা চুরির উত্তরের পক্ষে বা বিপক্ষে কী যুক্তি (Reasoning) দিচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে কোহলবার্গ নৈতিক বিকাশকে ৩টি প্রধান পর্যায় (Levels) এবং ৬টি উপস্তরে (Stages) ভাগ করেছেন:
১. প্রাক-প্রথাগত পর্যায় (Pre-Conventional Level) | বয়স: ৪ - ১০ বছর
এই পর্যায়ে শিশুর নিজস্ব কোনো নৈতিকতা বা বোধ থাকে না। তার ভালো-মন্দের বিচার সম্পূর্ণভাবে বাইরের পরিবেশের শাস্তি (Punishment), পুরস্কার বা ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়。
- উপস্তর ১: শাস্তি ও বাধ্যতা (Obedience and Punishment Orientation)
- ধারণা: শিশু নিয়ম মেনে চলে কেবল শাস্তি এড়ানোর জন্য。 বড়রা বা শক্তিশালী কেউ নিয়ম তৈরি করেছে, তাই তা মানতেই হবে।
- যুক্তি: "হাইনজের চুরি করা ভুল, কারণ পুলিশ তাকে ধরে জেলে দেবে (শাস্তি পাবে)।"
- উপস্তর ২: ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও পারস্পরিক বিনিময় (Individualism and Exchange / Instrumental Relativist)
- ধারণা: এই স্তরের মূল কথা হলো— "তুমি আমার একটা কাজ করে দাও, আমিও তোমার একটা কাজ করে দেব" (Mutual Exchange)। শিশু নিজের স্বার্থ বা চাহিদা পূরণের দিকে নজর দেয়।
- যুক্তি: "হাইনজ ওষুধ চুরি করতেই পারে, কারণ তার স্ত্রীকে বাঁচানো দরকার যা তার নিজের স্বার্থ, আর ব্যবসায়ী তো তার সাথে ভালো ব্যবহার করেনি।"
২. প্রথাগত পর্যায় (Conventional Level) | বয়স: ১০ - ১৩ বছর
এই স্তরে শিশু সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের নিয়মকানুন এবং প্রত্যাশাকে নিজের মনে করে মেনে নিতে শেখে। সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাই এখানে মূল লক্ষ্য হয়。
- উপস্তর ৩: ভালো ছেলে/ভালো মেয়ে মানসিকতা (Good Interpersonal Relationships / Good Boy-Nice Girl)
- ধারণা: সমাজ বা পরিবারের চোখে নিজেকে একজন আদর্শ ও ভালো মানুষ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা থাকে。 অন্যের অনুমোদন (Approval) পাওয়াটাই নৈতিকতার মাপকাঠি।
- যুক্তি: "হাইনজ একজন ভালো স্বামী, কারণ সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসে এবং সমাজ একজন ভালো স্বামীর কাছ থেকে এটাই আশা করে। চোর হওয়াটা খারাপ, কিন্তু সে তো বাধ্য হয়ে করেছে।"
- উপস্তর ৪: আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা (Maintaining the Social Order / Law and Order)
- ধারণা: সমাজের নিয়ম, আইনকানুন এবং কর্তব্যকে অন্ধভাবে ও কঠোরভাবে মেনে চলা। আইন সবার জন্য সমান এবং তা কোনো অবস্থাতেই ভাঙা উচিত নয়।
- যুক্তি: "ব্যক্তিগত পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আইন ভাঙা বা চুরি করা অপরাধ। সবাই যদি নিজের স্বার্থে আইন ভাঙতে শুরু করে, তবে সমাজ ভেঙে পড়বে।"
৩. উত্তর-প্রথাগত পর্যায় (Post-Conventional Level) | বয়স: ১৩ বছরের ঊর্ধ্বে
এটি নৈতিকতার সর্বোচ্চ স্তর, যেখানে পৌঁছাতে অনেক মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও পারেন না। এখানে নৈতিকতা বাইরের সমাজ বা আইনের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা ব্যক্তির নিজস্ব বিবেক, ন্যায়বিচার এবং বিশ্বজনীন মানবিক আদর্শের দ্বারা পরিচালিত হয়。
- উপস্তর ৫: সামাজিক চুক্তি ও ব্যক্তিগত অধিকার (Social Contract and Individual Rights)
- ধারণা: ব্যক্তি বোঝে যে আইন মানুষের কল্যাণের জন্যই তৈরি হয়েছে। কিন্তু যদি কোনো আইন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বা কোনো জীবনের ক্ষতি করে, তবে সবার সম্মতিতে সেই আইন পরিবর্তন বা সংশোধন করা সম্ভব。
- যুক্তি: "আইন অনুযায়ী চুরি করা ভুল হলেও, এখানে একটি জীবনের মূল্য আইনের চেয়ে অনেক বড়। তাই জীবনের অধিকার রক্ষার স্বার্থে নিয়মটি শিথিল হওয়া উচিত ছিল।"
- উপস্তর ৬: সর্বজনীন নৈতিক আদর্শ (Universal Ethical Principles)
- ধারণা: নৈতিকতার চূড়ান্ত স্তর। এখানে ব্যক্তি আইন বা সামাজিক চুক্তির ঊর্ধ্বে উঠে নিজের অন্তরাত্মা বা বিবেকের (Conscience) ডাকে সাড়া দেয়। মানবতা, জীবনরক্ষা ও চরম ন্যায়বিচারের জন্য সে নিজের জীবন বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত থাকে।
- যুক্তি: "যেকোনো মানুষের জীবনের মূল্য এই পৃথিবীর সমস্ত সম্পত্তি বা ওষুধের দামের চেয়ে কোটি গুণ বেশি। হাইনজ যদি ওষুধ চুরি না করত, তবে সে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করত।"
৪. কোহলবার্গের তত্ত্বের প্রধান সীমাবদ্ধতা (Criticisms)
- লিঙ্গ বৈষম্য (Discrimination) বা পক্ষপাতিত্ব (Gender Bias): মনোবিজ্ঞানী ক্যারল গিলিগান (Carol Gilligan) কোহলবার্গের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, কোহলবার্গ তাঁর গবেষণায় কেবল ছেলেদের (Male participants) অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পুরুষদের নৈতিকতা গড়ে ওঠে 'ন্যায়বিচারের' (Justice) ওপর ভিত্তি করে, আর নারীদের নৈতিকতা গড়ে ওঠে 'যত্ন ও সম্পর্কের' (Ethics of Care) ওপর ভিত্তি করে—যা কোহলবার্গ তাঁর তত্ত্বে উপেক্ষা করেছেন।
- কাল্পনিক পরিস্থিতি: হাইনজের গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ছিল। বাস্তব জীবনে মানুষ এই ধরণের পরিস্থিতিতে ঠিক কেমন আচরণ করবে, তা এই তত্ত্ব দিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায় না।
> * কোহলবার্গের মতে, নৈতিক বিকাশের জন্য শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ (Cognitive Development) বা যুক্তিবোধের (Cognitive reasoning) বিকাশ ঘটা আবশ্যক。
> * স্তরগুলি একটি নির্দিষ্ট ক্রম (Invariant sequence) মেনে চলে, অর্থাৎ কোনো স্তর বাদ দিয়ে এক足ে লাফিয়ে অন্য স্তরে যাওয়া যায় না।
> * Moral Dilemma (নৈতিক দ্বন্দ্ব) হলো সঠিক ও ভুলের মাঝখানের মানসিক লড়াই, আর Moral Reasoning (নৈতিক যুক্তিবোধ) হলো সেই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শিশুর দেওয়া যুক্তি。
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
10. বিকাশের বিভিন্ন দিক : কোহলবার্গের তত্ত্ব — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic