ব্যক্তিগত পার্থক্য এবং শিক্ষণ–শিখন (Individual Differences and Teaching–Learning)
Individual differences among learners and its educational implications in teaching learning process in Bengali for TET
Published by: TET Sampan Editorial Team
১. ব্যক্তিগত পার্থক্যের অর্থ (Meaning of Individual Differences)
সংজ্ঞা: কোনো একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা একাধিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একজন শিক্ষার্থীর সাথে অন্য একজন শিক্ষার্থীর যে রূপগত, গুণগত বা আচরণগত অমিল বা বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাকেই মনস্তত্ত্বে ব্যক্তিগত বৈচিত্র্য বা পার্থক্য (Individual Differences) বলা হয়।
একই বয়স, শ্রেণি বা সামাজিক পরিবেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বুদ্ধিমত্তা, আগ্রহ, যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব, শেখার গতি, ভাষা, আচরণ, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দক্ষতার ক্ষেত্রে যে ভিন্নতা দেখা যায়, তাকে ব্যক্তিগত পার্থক্য (Individual Differences) বলা হয়।
সহজভাবে—
প্রত্যেক শিক্ষার্থী নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, ক্ষমতা ও শেখার ধরনে অন্য শিক্ষার্থীর থেকে পৃথক।
দুইজন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ একই রকম নয়। এমনকি একই পরিবারের যমজ শিশুর মধ্যেও আগ্রহ, স্বভাব, বুদ্ধিমত্তা ও শেখার গতিতে পার্থক্য থাকতে পারে।
স্কিনার (Skinner)-এর মতে
ব্যক্তিগত পার্থক্য বলতে ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যকে বোঝায়, যা পরিমাপযোগ্য।
ড্রেভার (Drever)-এর মতে
ব্যক্তিত্বের যেকোনো বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির যে পার্থক্য দেখা যায়, সেটিই ব্যক্তিগত পার্থক্য।
ব্যক্তিগত পার্থক্যের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য
- ব্যক্তিগত পার্থক্য সর্বজনীন—সব মানুষের মধ্যেই পার্থক্য রয়েছে।
- প্রত্যেক ব্যক্তি অনন্য—দুজন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ এক নয়।
- পার্থক্য পরিমাণগত ও গুণগত উভয়ই হতে পারে।
- বংশগতি (Heredity) ও পরিবেশ উভয়ের প্রভাবে সৃষ্টি হয়।
- একই ব্যক্তির মধ্যেও বিভিন্ন ক্ষমতার অসম বিকাশ দেখা যায়।
- বয়স ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পার্থক্যের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
- ব্যক্তিগত পার্থক্য স্বাভাবিক; এটি কোনো ত্রুটি নয়।
- শিক্ষণ–শিখন প্রক্রিয়ায় এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
ব্যক্তিগত পার্থক্যের প্রকারভেদ (Types of Individual Differences)
শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই পার্থক্য মূলত দুটি স্তরে ঘটে:
- আন্তঃব্যক্তিগত পার্থক্য (Inter-individual Differences): যখন একজন শিক্ষার্থীর সাথে অন্য একজন শিক্ষার্থীর তুলনা করা হয় (যেমন: রাম অঙ্কে ভালো কিন্তু শ্যাম গানে ভালো)।
- অন্তর্ব্যক্তিক পার্থক্য (Intra-individual Differences): যখন একটি নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর নিজেরই বিভিন্ন গুণের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায় (যেমন: একটি শিশু হয়তো খুব ভালো লিখতে পারে, কিন্তু সে সবার সামনে দাঁড়িয়ে ভালো বলতে পারে না)।
২. ব্যক্তিগত বৈচিত্র্যের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ (Dimensions/Nature of Individual Differences)
শ্রেণীকক্ষে একজন শিক্ষকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূলত নিচের এই ক্ষেত্রগুলিতে বৈচিত্র্য বা পার্থক্য চোখে পড়ে:
- বৌদ্ধিক পার্থক্য (Intelligence): সব শিশুর বুদ্ধির স্তর এক নয়। ক্লাসে কিছু শিশু অতি-বুদ্ধিসম্পন্ন (Gifted), কিছু সাধারণ (Average) এবং কিছু ধীরগতির শিক্ষার্থী (Slow Learners) থাকে।
- আগ্রহ ও অভীক্ষা (Interest & Aptitude): কোনো শিক্ষার্থীর বিজ্ঞান বা অঙ্কে তীব্র আগ্রহ থাকতে পারে, আবার কেউ সাহিত্য, খেলাধুলা বা চিত্রকলায় পারদর্শী হতে পারে।
- উপস্থাপনা ও অংশগ্রহণের বৈচিত্র্য: শিশুর পূর্বজ্ঞান, ভাষা, আগ্রহ, সক্ষমতা ও কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী শেখার সহায়তা ভিন্ন হতে পারে। তবে কাউকে স্থায়ীভাবে “Visual”, “Auditory” বা “Kinesthetic শিক্ষার্থী” বলে চিহ্নিত করে শুধু একটি মাধ্যমেই শেখানো প্রমাণসমর্থিত নয়। একই ধারণা দৃশ্য, আলোচনা, লেখা ও হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে উপস্থাপন করলে সব শিক্ষার্থী অর্থ নির্মাণের একাধিক সুযোগ পায়।
- আবেগীয় ও মেজাজগত পার্থক্য (Emotional & Temperament Difference): কিছু শিশু খুব শান্ত, লাজুক এবং অন্তর্মুখী (Introvert) হয়, আবার কিছু শিশু খুব চঞ্চল, সামাজিক এবং বহির্মুখী (Extrovert) প্রকৃতির হয়।
- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি (Socio-cultural Background): শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পরিবার, ধর্ম, অর্থনৈতিক স্তর, জাতি এবং ভাষাভাষী অঞ্চল থেকে আসে। তাদের এই পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ তাদের আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে।
- শারীরিক ও সঞ্চালনমূলক পার্থক্য (Physical & Motor Development): শিক্ষার্থীদের উচ্চতা, ওজন, দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তির পার্থক্য থাকে। তাছাড়া কিছু শিক্ষার্থী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (Children with Special Needs - CWSN) হতে পারে।
৩. শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় এর শিক্ষাগত তাৎপর্য (Educational Implications)
একটি আদর্শ এবং আধুনিক শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় (Child-Centred Education) শিক্ষার্থীদের এই ব্যক্তিগত পার্থক্যকে 'সমস্যা' বা 'অভিশাপ' হিসেবে না দেখে, এটিকে ক্লাসরুমের একটি 'সম্পদ' বা 'বৈচিত্র্য' হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একজন শিক্ষকের করণীয় পদক্ষেপগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
ক. বৈচিত্র্যময় শিক্ষণ পদ্ধতি (Differentiated Instruction)
শিক্ষক ক্লাসে কেবল একটি নির্দিষ্ট বা গতানুগতিক পদ্ধতিতে (যেমন— শুধু লেকচার মেথড) পড়াবেন না। তিনি তাঁর পাঠদানে বৈচিত্র্য আনবেন। তিনি চার্ট, মডেল, অডিও-ভিজুয়াল উপকরণ, আলোচনা, প্রকল্প ও হাতে-কলমে কাজ ব্যবহার করবেন। এর উদ্দেশ্য শিশুকে কোনো স্থায়ী শেখার-ধরনের লেবেলে ভাগ করা নয়; বরং ধারণাটি বোঝা ও প্রকাশের একাধিক পথ তৈরি করা।
খ. নমনীয় পাঠ্যক্রম ও সময়সূচী (Flexible Curriculum)
পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস খুব বেশি কঠোর হওয়া উচিত নয়। এতে তাত্ত্বিক বিষয়ের পাশাপাশি সঙ্গীত, চারুকলা, সমাজসেবা, কম্পিউটার এবং খেলাধুলার মতো সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীর (Co-curricular activities) পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশু তার নিজস্ব আগ্রহ অনুযায়ী বিকাশের সুযোগ পায়।
গ. শিক্ষার্থীদের দল গঠন (Grouping of Learners)
- সমধর্মী দল গঠন (Homogeneous Grouping): বিশেষ ক্ষেত্রে বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিকারমূলক শিক্ষণের (Remedial Teaching) জন্য একই ধরণের পিছিয়ে পড়া শিশুদের নিয়ে দল গঠন করা যেতে পারে।
- মিশ্র দল গঠন (Heterogeneous Grouping): আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে এটি সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। একটি দলে অল-রাউন্ডার, গড়পড়তা এবং ধীরগতির শিক্ষার্থীদের একসাথে রাখা হয়, যাতে তারা ভাইগটস্কির তত্ত্ব মেনে পরস্পরের সাথে সহযোগিতামূলক ও যৌথ শিখনের (Peer Learning) মাধ্যমে শিখতে পারে।
ঘ. ব্যক্তিগত মনোযোগ ও প্রতিকারমূলক শিক্ষণ (Individual Attention & Remedial Teaching)
যেসব শিক্ষার্থী ধীরগতির (Slow Learners) বা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে, শিক্ষক তাদের চিহ্নিত করে আলাদাভাবে সময় দেবেন এবং তাদের দুর্বলতা দূর করার জন্য প্রতিকারমূলক শিক্ষণ (Remedial Teaching)-এর ব্যবস্থা করবেন। অন্যদিকে, অতি-বুদ্ধিসম্পন্ন (Gifted) শিশুদের জন্য সমৃদ্ধ পাঠ্যক্রমের (Enrichment Programmes) ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা বিরক্ত বোধ না করে।
ঙ. বহুমাত্রিক ও নমনীয় মূল্যায়ন (Continuous and Comprehensive Evaluation - CCE)
সব শিশুর মূল্যায়ন কেবল একটি ৩ ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষার খাতা দেখে করা যাবে না। মূল্যায়নে বৈচিত্র্য আনতে হবে— প্রজেক্ট, পোর্টফোলিও (Portfolio), মৌখিক উপস্থাপনা, বিতর্ক, কুইজ এবং সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হবে (গার্ডনারের বহুমুখী বুদ্ধি তত্ত্বের প্রয়োগ)।
চ. অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রেণীকক্ষ গঠন (Inclusive Classroom)
শিক্ষককে শ্রেণীকক্ষে এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে কোনো শিশুর লিঙ্গ, ধর্ম, অর্থনৈতিক অবস্থা বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে কেউ যেন অবহেলিত বোধ না করে। প্রতিটি শিশুর অনন্যতাকে (Uniqueness) শিক্ষককে সম্মান জানাতে হবে।
- কোনো দুই শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ এক নয়।
- ব্যক্তিগত পার্থক্য স্বাভাবিক ও সর্বজনীন।
- সব শিক্ষার্থীর শেখার গতি সমান নয়।
- ধীরে শেখা মানেই কম বুদ্ধিমান নয়।
- একই শিক্ষণ-পদ্ধতি সব শিক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়।
- শিক্ষককে শিশুকেন্দ্রিক ও নমনীয় পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
- শিক্ষার্থীর ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।
- ব্যক্তিগত পার্থক্য বিবেচনায় বিভেদিত শিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
- কেবল লিখিত পরীক্ষা শিশুর সামগ্রিক ক্ষমতা পরিমাপ (Measurement) করতে পারে না।
- শিক্ষার্থীকে তার সহপাঠীর সঙ্গে নয়, নিজের পূর্ববর্তী অগ্রগতির সঙ্গে তুলনা করা উচিত।
- বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা (Inclusive Education) প্রয়োজন।
- মিশ্র ক্ষমতার দল সহযোগিতামূলক শিক্ষণের জন্য কার্যকর।
- শিক্ষকের উচ্চ কিন্তু বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা শিক্ষার্থীর বিকাশে সহায়ক।
- ব্যক্তিগত পার্থক্যকে সমস্যা নয়, শ্রেণিকক্ষের বৈচিত্র্য ও সম্পদ হিসেবে দেখা উচিত।
- ব্যক্তিগত পার্থক্যের মূল কারণ হলো বংশগতি (Heredity) এবং পরিবেশ (Environment)-এর যৌথ মিথস্ক্রিয়া।
- ব্যক্তিগত বৈচিত্র্যকে মেনে নিয়ে শিক্ষাদান করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় Differentiated Instruction।
- আধুনিক মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী, শিক্ষককে শ্রেণীকক্ষের শিক্ষার্থীদের গড়পড়তা বা "Average" ধরে পড়ানো উচিত নয়, কারণ "No শিক্ষার্থী is average in all aspects."
- প্রগ্রেসিভ এডুকেশন (Progressive Education)-এর জনক জন ডিউই (John Dewey)-র মতে, শিক্ষা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত বৈচিত্র্য এবং সামাজিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উচিত।
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
16. ব্যক্তিগত পার্থক্য এবং শিক্ষণ–শিখন — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic