TET Sampan – বাংলায় সম্পূর্ণ TET প্রস্তুতি
Practice CentreTopic-wise mock tests with explanationsStart practising →
Weekly Mock Tests4 tests
বাংলা ভাষা · শিক্ষণ-পদ্ধতি

ভাষা অর্জন ও ভাষা শিখন (Learning and Acquisition)

ভাষা অর্জন ও ভাষা শিখনের সংজ্ঞা, পার্থক্য, প্রধান তত্ত্ব, প্রভাবক এবং শ্রেণিকক্ষের প্রয়োগ।

Published by: TET Sampan Editorial Team

ভাষা অর্জন (Language Acquisition) ও ভাষা শিখন (Language Learning)

মানুষ ভাষা আয়ত্ত করে প্রধানত দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে—স্বাভাবিক যোগাযোগে ভাষা অর্জন (Language Acquisition) এবং পরিকল্পিত অনুশীলনে ভাষা শিখন (Language Learning)। বাস্তবে এই দুই প্রক্রিয়া পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। অর্থপূর্ণ ভাষা-ব্যবহার, সচেতন অনুশীলন এবং উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে ভাষাদক্ষতা গড়ে তোলে।

ভাষা অর্জন

পরিবার ও সমাজে অন্যদের কথা শুনে, অর্থ বোঝার চেষ্টা করে এবং নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে গিয়ে শিশু স্বাভাবিকভাবে ভাষা অর্জন করে। এখানে ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করার আগে ভাষার ব্যবহার ঘটে। প্রক্রিয়াটি অনেকাংশে অবচেতন হলেও শিশু নিছক অনুকরণ করে না; শোনা ভাষা থেকে নিজেই নিয়ম অনুমান করে এবং নতুন বাক্য তৈরি করে।

শিশুর “আমি গেছিলাম” ধরনের রূপ দেখায় যে সে পরিচিত ক্রিয়ার নিয়ম নতুন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করছে। একে অতিসাধারণীকরণ (Overgeneralisation) বলা যায়। এমন ভুল ভাষা-বিকাশের স্বাভাবিক ধাপ; তা শিশুর সক্রিয় চিন্তার পরিচয়।

ভাষা-বিকাশের সাধারণ ধারা

ভাষা অর্জন জন্মের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমে শিশু কণ্ঠস্বর, ছন্দ ও পরিচিত ধ্বনির প্রতি সাড়া দেয়; পরে বাবলিং বা ধ্বনি (Sound)-খেলার মাধ্যমে উচ্চারণের অনুশীলন করে। একক শব্দ দিয়ে সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ, দুই শব্দের সংযোগ এবং ধীরে ধীরে দীর্ঘ বাক্য নির্মাণ—এই ধারায় তার ভাষা এগোয়। শব্দভান্ডার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন, অস্বীকৃতি, কাল ও সম্পর্কসূচক রূপের ব্যবহারও সমৃদ্ধ হয়।

এই ধাপগুলি কঠোর বয়সসীমা নয়। শিশুর ভাষিক পরিবেশ, যোগাযোগের সুযোগ, শ্রবণক্ষমতা, ব্যক্তিগত গতি এবং একাধিক ভাষার সংস্পর্শে বিকাশের ধরন বদলাতে পারে। তাই অন্য শিশুর সঙ্গে সরল তুলনার বদলে একই শিশুর ধারাবাহিক অগ্রগতি লক্ষ্য করা বেশি যুক্তিসংগত। ভাষা বোঝার ক্ষমতা অনেক সময় ভাষা বলার আগেই বিকশিত হয়; কম কথা বলা মানেই কম বোঝা—এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।

ভাষা শিখন

বিদ্যালয়ে বা পরিকল্পিত পরিবেশে শব্দভান্ডার, ব্যাকরণ, বানান, পাঠ ও লিখন সচেতনভাবে শেখা হলো ভাষা শিখন। শিক্ষক ব্যাখ্যা, উদাহরণ, অনুশীলন ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে ভাষার রূপ সম্পর্কে সচেতন করেন।

শুধু নিয়ম মুখস্থ করলেই সাবলীলতা আসে না। আবার সচেতন শিক্ষা অপ্রয়োজনীয়ও নয়—এটি শুদ্ধতা, সম্পাদনা, জটিল পাঠ বোঝা এবং প্রাতিষ্ঠানিক লেখার দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। শেখা নিয়মকে অর্থপূর্ণ যোগাযোগে ব্যবহার করার সুযোগ দিলে তা কার্যকর হয়।

ভাষা অর্জন সম্পর্কে প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি

আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (Behaviourist View) অনুকরণ, পুনরাবৃত্তি ও ইতিবাচক শক্তিবৃদ্ধির গুরুত্ব দেখায়। এগুলি শব্দ ও নির্দিষ্ট ভাষারীতি শেখাতে সহায়ক হলেও শিশু আগে না-শোনা বাক্য কীভাবে তৈরি করে, তার পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না। সহজাতবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (Nativist View) মানুষের জন্মগত ভাষা শেখার সামর্থ্য ও নিয়ম আবিষ্কারের ক্ষমতার ওপর জোর দেয়, কিন্তু সামাজিক পরিবেশের ভূমিকা একা এ দিয়ে বোঝানো যায় না।

সামাজিক–মিথস্ক্রিয়ামূলক দৃষ্টিভঙ্গি (Social Interactionist View) মনে করে, শিশুর অন্তর্নিহিত সামর্থ্য অর্থপূর্ণ সামাজিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। বড়রা শিশুর কথার বিস্তার ঘটান, প্রশ্ন করেন, ইঙ্গিত দেন এবং তার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ভাষা মিলিয়ে নেন। বর্তমান শিক্ষাচিন্তায় কোনো একটি ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণ বলে না ধরে অনুকরণ, মানসিক নিয়ম-নির্মাণ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ—সবগুলির সম্মিলিত ভূমিকা বিবেচনা করা হয়।

প্রধান পার্থক্য

দিকভাষা অর্জনভাষা শিখন
পরিবেশপরিবার, সমাজ ও স্বাভাবিক যোগাযোগ (Communication)শ্রেণিকক্ষ বা পরিকল্পিত পরিবেশ
সচেতনতাঅধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততুলনামূলকভাবে সচেতন
প্রধান লক্ষ্যঅর্থ বোঝা ও ভাব প্রকাশভাষার রূপ, নিয়ম ও দক্ষতার অনুশীলন
ভুলের প্রতিক্রিয়াকথোপকথনের মধ্যেই স্বাভাবিক সংশোধনশিক্ষক বা সহপাঠীর পরিকল্পিত প্রতিক্রিয়া
অগ্রগতিব্যবহার ও সংযোগের পরিমাণে প্রভাবিতঅনুশীলন, কৌশল ও শিক্ষাসহায়তায় প্রভাবিত

এই পার্থক্য চূড়ান্ত নয়। শ্রেণিকক্ষেও স্বাভাবিক অর্জনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে, আবার দৈনন্দিন জীবনেও কেউ সচেতনভাবে নতুন শব্দ বা রীতি শিখতে পারে।

অর্জন ও শিখনের পারস্পরিক সম্পর্ক

স্বাভাবিক যোগাযোগে অর্জিত ভাষা সাবলীলতা ও তাৎক্ষণিক ভাব প্রকাশের ভিত তৈরি করে। পরিকল্পিত শিখন সেই ভাষাকে বিশ্লেষণ, পরিমার্জন ও নতুন ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে সাহায্য করে। যেমন, শিশু কথোপকথনে অতীতকালের রূপ ব্যবহার করতে পারে; শ্রেণিকক্ষে গল্প সম্পাদনা করতে গিয়ে সে কাল ব্যবহারের নিয়ম সচেতনভাবে বুঝতে শেখে। আবার শেখা নতুন শব্দ গল্প, আলোচনা বা বাস্তব কাজে বারবার ব্যবহার করলে তা স্বতঃস্ফূর্ত ভাষার অংশ হয়ে ওঠে।

দৈনন্দিন কথোপকথনের ভাষা এবং পাঠ্যবিষয় বোঝা বা ব্যাখ্যামূলক লেখা তৈরির ভাষা এক নয়। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে তুলনা, কারণ–ফল, সংজ্ঞা, যুক্তি ও সারাংশ প্রকাশের ভাষা ধীরে ধীরে শেখাতে হয়। তাই শুধু কথায় সাবলীল দেখে তার পঠন বা প্রাতিষ্ঠানিক লিখনেও সমান দক্ষতা আছে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

প্রথম ভাষা, অতিরিক্ত ভাষা ও বহুভাষিকতা (Multilingualism)

শিশু যে ভাষা বা ভাষাগুলি ঘর ও নিকট সমাজে প্রথম আয়ত্ত করে, সেগুলি তার প্রথম ভাষা (First Language)। বহুভাষিক পরিবারে একাধিক প্রথম ভাষা থাকতে পারে। পরে শেখা ভাষাকে দ্বিতীয় বা অতিরিক্ত ভাষা (Additional Language) বলা অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক।

শিক্ষার্থীর ঘরের ভাষা কোনো বাধা নয়; নতুন ভাষা শেখার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পরিচিত ভাষার ধারণা, শব্দের সম্পর্ক, গল্প বা অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে নতুন ভাষায় সেতু তৈরি করা যায়। এক ভাষার জ্ঞান অন্য ভাষায় কাজে লাগাকে আন্তর্ভাষিক স্থানান্তর (Cross-linguistic Transfer) বলা হয়। তবে দুই ভাষার গঠন আলাদা হলে সাময়িক ভুলও হতে পারে; তা অযোগ্যতার প্রমাণ নয়।

বোধগম্য ভাষা, আবেগ ও মিথস্ক্রিয়া

ক্র্যাশেন ভাষা বিকাশে শিক্ষার্থীর বর্তমান সামর্থ্যের সামান্য ঊর্ধ্বে থাকা কিন্তু প্রসঙ্গের সাহায্যে বোঝা যায়—এমন বোধগম্য ভাষা-উপকরণ (Comprehensible Input)-এর গুরুত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর আবেগীয় বাধা (Affective Filter) ধারণা অনুযায়ী ভয়, লজ্জা বা অতিরিক্ত উদ্বেগ ভাষা ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। শেখা নিয়ম নিজের ভাষা যাচাই বা সম্পাদনায় যে ভূমিকা রাখে, তাকে তিনি পর্যবেক্ষক (Monitor) হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

এগুলি প্রভাবশালী অনুমান, সর্বক্ষেত্রে প্রমাণিত অপরিবর্তনীয় সূত্র নয়। শুধু ভাষা শোনা যথেষ্ট নয়; কথা বলা, লেখা, অর্থ নিয়ে দরকষাকষি, সহপাঠীর সঙ্গে কাজ এবং উপযুক্ত প্রতিক্রিয়াও জরুরি। যোগাযোগে ভুল বোঝাবুঝি হলে প্রশ্ন করা, পুনরায় বলা বা উদাহরণ চাওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী ভাষার অর্থ ও রূপ আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে।

ভুল ও মধ্যবর্তী ভাষা

নতুন ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে শিক্ষার্থী নিজের জানা নিয়ম ও প্রথম ভাষার সহায়তায় একটি পরিবর্তনশীল ভাষাব্যবস্থা গড়ে তোলে; একে মধ্যবর্তী ভাষা (Interlanguage) বলা হয়। তাই সব ভুল অসাবধানতা নয়। কোনো ভুল বারবার হলে তা শিক্ষার্থীর বর্তমান ধারণা সম্পর্কে শিক্ষককে তথ্য দেয়।

প্রতিটি বাক্যের মাঝখানে বাধা দিয়ে সংশোধন করলে কথা বলার সাহস কমতে পারে। অর্থ ব্যাহত হলে তাৎক্ষণিক সহায়তা এবং অনুশীলনের পরে নির্বাচিত ভুল নিয়ে আলোচনা বেশি ফলপ্রসূ। শিক্ষক সঠিক রূপটি স্বাভাবিকভাবে পুনর্ব্যক্ত করতে পারেন, ইঙ্গিত দিতে পারেন বা শিক্ষার্থীকে নিজে সংশোধনের সুযোগ দিতে পারেন।

শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ

  • গল্প, ছবি, সংলাপ, ভূমিকা-অভিনয় ও বাস্তব পরিস্থিতির মাধ্যমে অর্থপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করাতে হবে।
  • শোনা ও পড়ার পর্যাপ্ত উপকরণের সঙ্গে কথা বলা ও লেখার নিয়মিত সুযোগ রাখতে হবে।
  • শিক্ষার্থীর ঘরের ভাষাকে তুলনা, ব্যাখ্যা ও ভাব প্রকাশের সেতু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
  • ব্যাকরণ ও শব্দরীতি বিচ্ছিন্ন সংজ্ঞা হিসেবে নয়, পাঠ ও ব্যবহারের প্রসঙ্গে শেখাতে হবে।
  • ভুলকে উপহাস বা শাস্তির কারণ না করে শেখার অগ্রগতি বোঝার উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।
  • একই শ্রেণির ভিন্ন ভাষাগত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ছবি, শব্দতালিকা, বাক্যের সূত্র বা অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ দিতে হবে।
  • পর্যবেক্ষণ, কথোপকথন, পাঠ-প্রতিক্রিয়া ও ছোট লেখার মাধ্যমে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Formative Assessment) করতে হবে।

ভাষা শেখানোর মূল লক্ষ্য কেবল নিয়ম জানা নয়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে স্পষ্টভাবে বুঝতে ও ভাব প্রকাশ করতে পারা। নিরাপদ পরিবেশ, সমৃদ্ধ ভাষা-উপকরণ, সক্রিয় মিথস্ক্রিয়া এবং প্রয়োজনমাফিক সচেতন নির্দেশনা—এই চারটির সমন্বয়েই ভাষা অর্জন ও ভাষা শিখন পরস্পরকে শক্তিশালী করে।

PRACTICE QUIZ

Take a Test from This Topic

এই বিষয়ের অনুশীলনী
30 questions

Start quiz →