জীবিকা নির্বাহ
গ্রামীণ ও শহুরে জীবিকা, কৃষিশ্রমিক, ক্ষুদ্র কৃষক, স্বনিযুক্তি, মজুরি, অনানুষ্ঠানিক কাজ ও জীবিকার নিরাপত্তার বাংলা আলোচনা।
Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team
জীবিকা নির্বাহ (Livelihood)
মানুষ খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণের জন্য যে কাজের মাধ্যমে আয় বা উৎপাদন করে, তাকে জীবিকা বলা হয়। জীবিকার ধরন স্থানীয় সম্পদ, দক্ষতা, শিক্ষা, জমি, পুঁজি, বাজার, প্রযুক্তি এবং সামাজিক সুযোগের ওপর নির্ভর করে। একই পরিবারের সদস্যরা একাধিক জীবিকার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।
গ্রামীণ জীবিকা
গ্রামে কৃষি (Agriculture), কৃষিশ্রম, পশুপালন, মৎস্যচাষ, বনজ দ্রব্য সংগ্রহ, কারুশিল্প, দোকান, পরিবহণ (Transport) ও সরকারি-বেসরকারি পরিষেবার কাজ দেখা যায়। সব গ্রামীণ মানুষ কৃষক নন এবং সব কৃষকের নিজের জমি নেই।
কৃষক (Farmer) ও কৃষিশ্রমিক (Agricultural Labourer)
বড় কৃষকের তুলনায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জমি, পুঁজি, সেচ ও বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতা কম। ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক অন্যের জমিতে মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন। কৃষিকাজ ঋতুভিত্তিক হওয়ায় বছরের সব সময় কাজ নাও থাকতে পারে। মজুরি নগদ, শস্য বা উভয় রূপে দেওয়া হতে পারে।
উৎপাদনের খরচ ও ঋণ
বীজ, সার, সেচ, যন্ত্র ও শ্রমের জন্য কৃষকের অর্থ দরকার। ফসল নষ্ট হলে বা বাজারদর কমলে ঋণ শোধ করা কঠিন হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সাধারণত নিয়ন্ত্রিত শর্তে পাওয়া যায়; অনানুষ্ঠানিক ঋণে সুদ বেশি হতে পারে। সংরক্ষণ, বাজারে প্রবেশ ও ন্যায্য মূল্য কৃষকের আয়কে প্রভাবিত করে।
অ-কৃষি গ্রামীণ কাজ
দুধ উৎপাদন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছধরা, তাঁত, মৃৎশিল্প, নির্মাণ, দোকান ও যানবাহন চালানো গ্রামীণ আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। জীবিকার বৈচিত্র্য একটি কাজের ব্যর্থতার ঝুঁকি কমায়। বহু মানুষ কাজের সন্ধানে ঋতুভিত্তিক বা দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন করেন।
শহুরে জীবিকা
শহরে কারখানা, নির্মাণ, দোকান, পরিবহণ, গৃহকর্ম, রাস্তার ব্যবসা, মেরামত, দপ্তর, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা কাজ রয়েছে। কিছু কাজ নিয়মিত বেতন, লিখিত নিয়োগপত্র ও সামাজিক সুরক্ষা দেয়; বহু কাজ অনিয়মিত ও অনিরাপদ।
স্বনিযুক্তি (Self-employment) ও মজুরিভিত্তিক কাজ (Wage Employment)
যিনি নিজের ক্ষুদ্র ব্যবসা বা পেশা পরিচালনা করেন তিনি স্বনিযুক্ত। দোকানি, ফেরিওয়ালা, কারিগর ও রিকশাচালক এর উদাহরণ হতে পারেন। অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অধীনে মজুরি বা বেতনের বিনিময়ে কাজ হল মজুরিভিত্তিক কাজ। উভয় ক্ষেত্রেই আয় নিয়মিত বা অনিয়মিত হতে পারে।
সংগঠিত ক্ষেত্র (Organised Sector) ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র (Informal Sector)
নিয়মিত নথিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত নিয়ম, কর্মঘণ্টা, ছুটি ও সামাজিক সুরক্ষাসহ কাজকে সাধারণত সংগঠিত ক্ষেত্রের কাজ বলা হয়। অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি, চাকরির নিশ্চয়তা, নির্দিষ্ট মজুরি বা সামাজিক সুরক্ষা প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে। তবে কাজের ক্ষেত্র ও কর্মীর বাস্তব শর্ত বিচার করাই গুরুত্বপূর্ণ।
রাস্তার বিক্রেতা (Street Vendor)
রাস্তার বিক্রেতারা শহরে সুলভ পণ্য ও পরিষেবা দেন এবং নিজের জীবিকা অর্জন করেন। তাঁরা স্বনিযুক্ত হলেও স্থান, ঋণ, সংরক্ষণ, আবহাওয়া (Weather) ও উচ্ছেদের সমস্যায় পড়তে পারেন। নগর পরিকল্পনায় জীবিকার অধিকার এবং পথচারী ও যানচলাচলের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য দরকার।
অদৃশ্য শ্রম (Invisible Work) ও অবৈতনিক শ্রম (Unpaid Work)
রান্না, পরিচর্যা, জল আনা, শিশু ও প্রবীণের দেখাশোনার মতো গৃহস্থালির কাজ পরিবার ও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হলেও অনেক সময় মজুরি পায় না এবং কাজ হিসেবে স্বীকৃতিও কম। এই কাজের বড় অংশ নারীরা করেন। কাজের মূল্য শুধু নগদ আয় দিয়ে বিচার করলে এই অবদান অদৃশ্য থেকে যায়।
মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা
ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বিশ্রাম, বৈষম্যহীনতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার সুযোগ মর্যাদাপূর্ণ কাজের অংশ। জীবিকার নিরাপত্তা ব্যক্তির দক্ষতার পাশাপাশি আইন, বাজার ও জননীতির ওপরও নির্ভর করে।
মূল ধারণা
| বিষয় | অর্থ |
|---|---|
| জীবিকা | প্রয়োজন পূরণের জন্য আয় বা উৎপাদনের কাজ |
| স্বনিযুক্তি | নিজের পেশা বা ব্যবসার মাধ্যমে কাজ |
| মজুরিভিত্তিক কাজ | অন্যের অধীনে মজুরি বা বেতনের বিনিময়ে কাজ |
| অনানুষ্ঠানিক কাজ | চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা সাধারণত সীমিত |
| ঋতুভিত্তিক অভিবাসন | কাজের জন্য বছরের নির্দিষ্ট সময় অন্যত্র যাওয়া |
জমি ও গ্রামীণ শ্রেণিবিন্যাস
জমির মালিকানা ও আকার গ্রামীণ জীবিকায় বড় পার্থক্য তৈরি করে। বড় কৃষক শ্রমিক নিয়োগ ও যন্ত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন; ক্ষুদ্র কৃষক প্রায়ই পারিবারিক শ্রমের ওপর নির্ভর করেন; ভাগচাষি অন্যের জমিতে চাষ করে উৎপাদনের অংশ দেন; ভূমিহীন শ্রমিক মজুরির ওপর নির্ভর করেন। বাস্তবে একই ব্যক্তি একাধিক ভূমিকায় থাকতে পারেন।
শহরের নিয়মিত ও দৈনিক কাজ
নিয়মিত বেতনের কাজে মাসিক আয়, ছুটি ও চাকরির কিছু নিরাপত্তা থাকতে পারে। দৈনিক মজুরির শ্রমিক প্রতিদিন কাজ পাওয়ার ওপর নির্ভর করেন এবং অসুস্থতা বা কাজ বন্ধ থাকলে আয় হারান। কাজের স্থায়িত্ব আয়ের পরিমাণের মতোই জীবিকার নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
উৎপাদক থেকে ভোক্তা
কৃষক বা কারিগরের পণ্য সংগ্রাহক, পাইকার, পরিবহণকারী ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। এই শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে মূল্য যোগ হয়, কিন্তু উৎপাদক সবসময় চূড়ান্ত মূল্যের বড় অংশ পান না। সংরক্ষণের অভাব ও জরুরি ঋণ কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা কমাতে পারে।
জীবিকা ও অভিবাসন (Migration)
কাজের অভাব, কম মজুরি, ফসলহানি বা ঋণ মানুষকে অন্যত্র যেতে বাধ্য করতে পারে; ভালো কাজ, শিক্ষা ও পরিষেবার আকর্ষণও অভিবাসন ঘটায়। অভিবাসী শ্রমিক শহরের নির্মাণ, পরিবহণ ও পরিষেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বাসস্থান, নথি ও সামাজিক সুরক্ষার সমস্যায় পড়তে পারেন।
কাজ, কর্মসংস্থান (Employment) ও বেকারত্ব (Unemployment)
কাজ বলতে মজুরিপ্রাপ্ত কাজের পাশাপাশি নিজের উৎপাদন ও অবৈতনিক পরিচর্যার কাজও বোঝায়। কাজ করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম হয়েও উপযুক্ত কাজ না পাওয়া বেকারত্ব। কৃষিতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মানুষ যুক্ত থাকলেও কয়েকজন সরে গেলে উৎপাদন না কমলে তা প্রচ্ছন্ন বেকারত্বের লক্ষণ।
মজুরির বিভিন্ন রূপ
মজুরি দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, কাজের পরিমাণভিত্তিক বা উৎপাদনের অংশ হিসেবে দেওয়া হতে পারে। কেবল ঘোষিত মজুরি নয়, বাস্তবে কত ঘণ্টা কাজ, কত নিয়মিত কাজ এবং কোনো সুবিধা পাওয়া যায় কি না—এসবও কাজের মান নির্ধারণ করে। নারী ও প্রান্তিক শ্রমিক একই কাজে কম মজুরি পেলে তা বৈষম্য (Discrimination)।
গৃহকর্মী ও নির্মাণশ্রমিক
গৃহকর্মীরা ব্যক্তিগত বাড়িতে রান্না, পরিষ্কার ও পরিচর্যার কাজ করেন; কর্মস্থল বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সংগঠিত হওয়া ও অধিকার দাবি কঠিন হতে পারে। নির্মাণশ্রমিকের কাজ প্রকল্পভিত্তিক এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। নিরাপত্তা-সরঞ্জাম, কাজের সময়, ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক সুরক্ষা উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
বাজার, মধ্যস্বত্বভোগী (Middleman) ও দরকষাকষি (Bargaining)
ক্ষুদ্র উৎপাদক অল্প পরিমাণ পণ্য, সংরক্ষণের অভাব বা ঋণের চাপে দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হলে দাম ঠিক করার ক্ষমতা কমে। সমবায়, উৎপাদক গোষ্ঠী, বাজারের তথ্য ও সরাসরি বিক্রির সুযোগ দরকষাকষি বাড়াতে পারে। তবে বাজারে প্রবেশের জন্য রাস্তা, পরিবহণ ও মানরক্ষাও দরকার।
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
| ধারণা | অর্থ |
|---|---|
| বেকারত্ব | কাজ করতে চেয়েও উপযুক্ত কাজ না পাওয়া |
| ঋতুভিত্তিক বেকারত্ব | বছরের নির্দিষ্ট সময় কাজ না থাকা |
| প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব | প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শ্রম যুক্ত থাকা |
| নিয়মিত কর্মসংস্থান | ধারাবাহিক কাজ ও নির্ধারিত আয় |
| দৈনিক মজুরি | কাজ পাওয়া দিনের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক |
জীবিকা ও সাংবিধানিক নীতি
সংবিধান (Constitution) প্রত্যেককে নির্দিষ্ট চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন, শোষণ থেকে সুরক্ষা এবং ন্যায্য কাজের পরিবেশের ভিত্তি তৈরি করে। মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) ও রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy) একসঙ্গে জীবিকার সামাজিক প্রেক্ষিত বোঝায়।
| অনুচ্ছেদ | জীবিকার সঙ্গে সম্পর্ক |
|---|---|
| ১৬ | সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতা |
| ১৯(১)(ছ) | যুক্তিসংগত সীমার মধ্যে পেশা, ব্যবসা বা জীবিকা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা |
| ২১ | জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা; মর্যাদাপূর্ণ জীবনের বিস্তৃত ভিত্তি |
| ২৩ | মানব পাচার ও জবরদস্তি শ্রমের নিষেধ |
| ২৪ | নির্দিষ্ট বিপজ্জনক কাজে চৌদ্দ বছরের কম বয়সি শিশুর নিয়োগ নিষিদ্ধ |
| ৩৯(ঘ) | নারী ও পুরুষের সমকাজে সমবেতনের নীতিগত নির্দেশ |
| ৪৩ | শ্রমিকের জীবনধারণযোগ্য মজুরি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের লক্ষ্য |
ন্যূনতম মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার আইনগুলি এই বৃহত্তর সাংবিধানিক মূল্যবোধ বাস্তবায়নের উপায়। আইন থাকলেও শ্রমিকের কাছে তথ্য, অভিযোগ ও প্রতিকার পৌঁছানো জরুরি।
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
37. জীবিকা নির্বাহ — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic