সরকার
সরকারের প্রয়োজন, কাজ, স্তর, অঙ্গ, আইন, অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক শাসনের বাংলা আলোচনা।
Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team
সরকার (Government)
সমাজে বহু মানুষের চাহিদা ও স্বার্থের সমন্বয়, আইন প্রণয়ন, জনসেবা পরিচালনা এবং বিরোধ মীমাংসার জন্য সংগঠিত কর্তৃপক্ষ দরকার। এই কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠান ও প্রতিনিধিদের সমষ্টিই সরকার। সরকার রাষ্ট্রের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে।
সরকার কেন প্রয়োজন
সরকার শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখে, আইন তৈরি ও কার্যকর করে, অধিকার রক্ষা করে, কর সংগ্রহ করে এবং জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করে। রাস্তা, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, পানীয় জল, পরিবহণ (Transport), দুর্যোগ মোকাবিলা ও পরিবেশ রক্ষার মতো কাজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।
সরকারের প্রধান কাজ
- আইন প্রণয়ন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা
- দেশের প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা
- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, জল ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা
- কর সংগ্রহ এবং জনকল্যাণে অর্থ ব্যয়
- দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা
- প্রাকৃতিক সম্পদ (Natural Resources) ও পরিবেশের ব্যবস্থাপনা
সরকারের স্তর
| স্তর | কাজের পরিসর |
|---|---|
| স্থানীয় সরকার (Local Government) | গ্রাম, শহর বা মহানগরের স্থানীয় সমস্যা ও পরিষেবা |
| রাজ্য সরকার | একটি রাজ্যের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি (Agriculture), পুলিশসহ বহু বিষয় |
| কেন্দ্রীয় সরকার | সমগ্র দেশ, প্রতিরক্ষা, মুদ্রা, বৈদেশিক সম্পর্কসহ জাতীয় বিষয় |
ভারতে ক্ষমতা বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। একই বিষয়ে কখনও একাধিক স্তর সমন্বয় করে কাজ করে।
সরকারের তিন অঙ্গ (Organs of Government)
আইনসভা (Legislature) আইন প্রণয়ন করে, কার্যনির্বাহী বিভাগ আইন ও নীতি কার্যকর করে এবং বিচার বিভাগ (Judiciary) আইন ব্যাখ্যা করে ও বিরোধের বিচার করে। ক্ষমতার এই বিভাজন এক প্রতিষ্ঠানের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া রোধে সহায়ক।
গণতান্ত্রিক সরকার (Democratic Government)
গণতন্ত্রে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকেরা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি বেছে নেন। সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করে, নির্দিষ্ট সময় পরে নির্বাচন হয়, মতপ্রকাশের সুযোগ থাকে এবং আইন সবার ওপর প্রযোজ্য হয়। শুধু নির্বাচন থাকাই যথেষ্ট নয়; স্বাধীন পছন্দ, ন্যায্য প্রতিযোগিতা, অধিকার ও আইনের শাসনও দরকার।
অগণতান্ত্রিক শাসন (Non-democratic Rule)
যে শাসনে জনগণ শাসক নির্বাচন বা পরিবর্তনের কার্যকর সুযোগ পায় না এবং ক্ষমতা একজন বা অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তা অগণতান্ত্রিক। সেখানে বিরোধী মত, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে।
আইন (Law) ও নাগরিক অংশগ্রহণ (Civic Participation)
আইন সমাজে গ্রহণযোগ্য আচরণের সাধারণ নিয়ম নির্ধারণ করে। সরকার আইন তৈরি করলেও নাগরিকেরা ভোটদান, জনআলোচনা, আবেদন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, সামাজিক উদ্যোগ এবং প্রতিনিধিদের প্রশ্ন করার মাধ্যমে শাসনে অংশ নেন। নাগরিক অংশগ্রহণ সরকারকে অধিক জবাবদিহিমূলক করে।
মূল ধারণা
| বিষয় | সঠিক ধারণা |
|---|---|
| সরকার | রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানসমষ্টি |
| রাষ্ট্র | নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন রাজনৈতিক সংগঠন |
| গণতন্ত্র | জনগণের সম্মতি, অংশগ্রহণ, অধিকার ও জবাবদিহিভিত্তিক শাসন |
| আইনসভা | আইন প্রণয়নকারী অঙ্গ |
| কার্যনির্বাহী | আইন ও নীতি বাস্তবায়নকারী অঙ্গ |
| বিচার বিভাগ | আইন ব্যাখ্যা ও বিচারকারী অঙ্গ |
সরকারের ক্ষমতার ক্ষেত্র (Jurisdiction)
সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত যে এলাকা ও মানুষের ওপর প্রযোজ্য, তাকে তার ক্ষমতার ক্ষেত্র বলা যায়। গ্রাম পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত একটি স্থানীয় এলাকার মধ্যে সীমিত, রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট রাজ্যে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত সমগ্র দেশে প্রযোজ্য হতে পারে। সব স্তর সংবিধান (Constitution) ও আইনের নির্ধারিত সীমার মধ্যে কাজ করে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিরোধ মীমাংসা
জল, জমি, ভাষা বা জনসম্পদের ব্যবহার নিয়ে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও অঞ্চলের মধ্যে বিরোধ হতে পারে। সরকার আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সমাধানের চেষ্টা করে; আদালত আইনগত বিরোধের বিচার করে। জনস্বার্থের সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মতামত, তথ্য ও ন্যায্য পুনর্বাসন বিবেচনা করা দরকার।
সরকার ও জনপরিষেবা (Public Services)
জনপরিষেবা এমন ব্যবস্থা যার সুবিধা সমাজের সবার কাছে পৌঁছানো জরুরি। নিরাপদ জল, প্রাথমিক স্বাস্থ্য, বিদ্যালয়, সড়ক ও পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে লাভের ক্ষমতার বদলে মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। সরকার নিজে পরিষেবা দিতে পারে বা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় অন্য সংস্থাকে যুক্ত করতে পারে; চূড়ান্ত জবাবদিহি সরকারেরই থাকে।
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র (Representative Democracy)
বৃহৎ দেশে সব নাগরিক প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি নিতে পারেন না। তাই তাঁরা প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। প্রতিনিধি জনগণের হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেও পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সীমাহীন ক্ষমতা পান না; আইন, আদালত, জনমত (Public Opinion) এবং আইনসভার নজরদারি তাঁর ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সরকারের ধরন
গণতন্ত্রে শাসকের ক্ষমতা জনগণের সম্মতি ও সংবিধান থেকে আসে। রাজতন্ত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ সাধারণত বংশানুক্রমিক; রাজতন্ত্র (Monarchy) সাংবিধানিক বা নিরঙ্কুশ হতে পারে। একনায়কতন্ত্রে ক্ষমতা একজন ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত এবং শাসক পরিবর্তনে জনগণের কার্যকর ভূমিকা সীমিত।
সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার (Universal Adult Franchise)
নির্ধারিত বয়সের সব নাগরিকের ধর্ম, জাতপাত, লিঙ্গ, শিক্ষা বা সম্পত্তি নির্বিশেষে ভোট দেওয়ার অধিকারকে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার বলে। ভারতে ভোটদানের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। ভোট দেওয়া রাজনৈতিক সমতার মৌলিক প্রকাশ।
সরকার ও জনস্বার্থের সিদ্ধান্ত
বড় বাঁধ, রাস্তা, কারখানা বা সংরক্ষিত অঞ্চল তৈরির সিদ্ধান্তে বহু মানুষের স্বার্থ জড়িত থাকে। সরকারকে সম্ভাব্য সুবিধা, পরিবেশগত ক্ষতি, জীবিকাহানি ও স্থানচ্যুতি বিবেচনা করতে হয়। জনশুনানি, তথ্যপ্রকাশ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তে সহায়ক।
সরকারের স্তর চেনার সূত্র
| পরিস্থিতি | প্রধান স্তর |
|---|---|
| গ্রামের নিকাশি বা পথবাতি | স্থানীয় সরকার |
| রাজ্যের পুলিশ ও সরকারি হাসপাতাল | রাজ্য সরকার |
| জাতীয় প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক | কেন্দ্রীয় সরকার |
একাধিক স্তর যুক্ত থাকলেও কোন স্তরের প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব, সেটি আলাদা করে বোঝা জরুরি।
ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি
ভারত একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (Republic)। সরকার সংবিধান থেকে ক্ষমতা পায় এবং সেই ক্ষমতা সংবিধানের সীমার মধ্যে ব্যবহার করে। কেন্দ্রীয়, রাজ্য ও স্থানীয় সরকার আলাদা স্তরে কাজ করলেও তারা পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়।
সরকারকে সীমাবদ্ধ রাখে যে বিধানগুলি (Checks on Government)
| সাংবিধানিক ভিত্তি | কার্যকারিতা |
|---|---|
| মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) | ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করে |
| ক্ষমতার বিভাজন (Separation of Powers) | একই প্রতিষ্ঠানের হাতে সব ক্ষমতা জমা হতে বাধা দেয় |
| বিচারিক পর্যালোচনা (Judicial Review) | সংবিধানবিরোধী আইন ও পদক্ষেপ যাচাই করে |
| নিয়মিত নির্বাচন | শাসক পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ সুযোগ দেয় |
| আইনসভার নিয়ন্ত্রণ | প্রশ্ন, বাজেট ও বিতর্কে কার্যনির্বাহীকে জবাবদিহি করায় |
অনুচ্ছেদ ৩২৬ লোকসভা (Lok Sabha) ও বিধানসভার নির্বাচনে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তি দেয়। ভারতে ভোটদানের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর।
ভারতীয় সরকারের প্রধান অঙ্গগুলির বিস্তৃত পরিচয়
| অঙ্গ | প্রধান প্রতিষ্ঠান | মূল কাজ |
|---|---|---|
| আইন বিভাগ (Legislature) | সংসদ (Parliament) ও রাজ্য আইনসভা | আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন ও কার্যনির্বাহীকে নিয়ন্ত্রণ |
| কার্যনির্বাহী বিভাগ (Executive) | রাষ্ট্রপতি (President), প্রধানমন্ত্রী (Prime Minister) ও মন্ত্রিসভা (Council of Ministers); রাজ্যে রাজ্যপাল (Governor), মুখ্যমন্ত্রী (Chief Minister) ও মন্ত্রিসভা | আইন ও নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসন পরিচালনা |
| বিচার বিভাগ (Judiciary) | সর্বোচ্চ আদালত, উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালত | আইন ব্যাখ্যা, বিরোধ নিষ্পত্তি ও অধিকার রক্ষা |
ভারতে এই অঙ্গগুলির কাজ পৃথক হলেও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় মন্ত্রীরা আইনসভার সদস্য হন, রাষ্ট্রপতি সংসদের অংশ এবং আদালত আইনসভার আইনের সাংবিধানিক বৈধতা যাচাই করতে পারে।
ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ
সংবিধানে কঠোরভাবে তিনটি জলরোধী ভাগ তৈরি করা হয়নি; কার্যভিত্তিক পৃথকীকরণ ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে। আইনসভা প্রশ্ন, বাজেট ও অনাস্থার মাধ্যমে কার্যনির্বাহীকে নিয়ন্ত্রণ করে। কার্যনির্বাহী বিল, নীতি ও অধ্যাদেশের উদ্যোগ নিতে পারে। বিচার বিভাগ বিচারিক পর্যালোচনা (Judicial Review) করে; সংসদ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আইন সংশোধন এবং বিচারকের অপসারণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
রাজনৈতিক ও স্থায়ী কার্যনির্বাহী
মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক কার্যনির্বাহী (Political Executive) নির্বাচনী ফল ও আইনসভার আস্থার ওপর নির্ভরশীল এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রশাসনিক আধিকারিকদের স্থায়ী কার্যনির্বাহী (Permanent Executive) বলা হয়; সরকার পরিবর্তিত হলেও তাঁরা নিয়ম অনুযায়ী প্রশাসন চালান এবং নীতি বাস্তবায়নে পেশাগত সহায়তা দেন। চূড়ান্ত রাজনৈতিক জবাবদিহি নির্বাচিত মন্ত্রীদের।
সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান
সংবিধান সরাসরি যে প্রতিষ্ঠান বা পদ সৃষ্টি করেছে, তা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান (Constitutional Body)—যেমন নির্বাচন কমিশন, অর্থ কমিশন এবং নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব নিরীক্ষক। সংসদের আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান (Statutory Body)। প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, তার সৃষ্টির আইনি উৎস এই পার্থক্য নির্ধারণ করে।
জরুরি অবস্থাতেও সাংবিধানিক সরকার
সংবিধানে জাতীয়, রাজ্য-শাসনসংক্রান্ত এবং আর্থিক জরুরি অবস্থার বিধান রয়েছে। জরুরি ক্ষমতা সাধারণ সময়ের ক্ষমতার সমান নয়; ঘোষণার শর্ত, সংসদীয় অনুমোদন, সময়সীমা ও বিচারিক পর্যালোচনার বিধান প্রযোজ্য। জরুরি অবস্থা সংবিধানকে স্থগিত করে না, বরং সংবিধানের বিশেষ বিধানের অধীন সরকার পরিচালিত হয়।
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
35. সরকার — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic