ধ্বনি ও বর্ণ
বাংলা ভাষার ধ্বনি ও বর্ণ (for TET WBTET STET CTET for Freshers and In-Service Teachers)
Author: Mr. Sandipan Roy, M.A., B.Ed. Last reviewed: 2026-09-25Report a correction
ধ্বনি ও বর্ণ এক জিনিস নয়। ধ্বনি উচ্চারণ ও শ্রবণের সঙ্গে যুক্ত; বর্ণ লিখিত ভাষার চিহ্ন। বাংলা বানান বুঝতে এই পার্থক্য জানা দরকার, কিন্তু লিখিত বর্ণমালার প্রতিটি চিহ্নের জন্য কথ্য ভাষায় আলাদা ধ্বনি আছে—এমন ধরে নেওয়া ভুল।
উচ্চারণ ও লিখিত চিহ্ন আলাদা করে দেখুন
‘ই’ ও ‘ঈ’ বানানে আলাদা বর্ণ। আধুনিক প্রমিত বাংলায় সাধারণভাবে সংস্কৃতের মতো স্বরের দৈর্ঘ্য দিয়ে এদের অর্থভেদ হয় না। তাই বর্ণের নাম ‘হ্রস্ব ই’ ও ‘দীর্ঘ ঈ’ হওয়া এবং বাংলার প্রতিটি উচ্চারণে একটিকে ছোট, অন্যটিকে দীর্ঘ বলা এক দাবি নয়। ‘স’, ‘শ’ ও ‘ষ’-এর বানানভেদও সব প্রসঙ্গে তিনটি পৃথক উচ্চারণ নিশ্চিত করে না। কথ্য রীতি ও শব্দের অবস্থান বিবেচনা করুন।
ধ্বনির সংজ্ঞায় ‘অর্থপূর্ণ আওয়াজ’ বললে অসুবিধা হয়। ভাষার একটি ধ্বনি একা অর্থ প্রকাশ না করেও শব্দের গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ বা প্-এর মতো ধ্বনি শব্দের মধ্যে আসে; প্রতিটি ধ্বনিকে আলাদা অর্থবাহী শব্দ হতে হবে না।
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি
স্বরধ্বনি উচ্চারণে বায়ুপ্রবাহে ব্যঞ্জনের মতো সম্পূর্ণ বন্ধ বা প্রবল সংকোচন থাকে না। ব্যঞ্জনধ্বনিতে মুখগহ্বরের কোনো স্থানে বন্ধ, সংকোচন বা অন্য ধরনের বাধা কাজ করে। শুধু বর্ণের লিখিত নামের বদলে উচ্চারণ শুনে বিষয়টি বুঝতে হবে।
প্রচলিত বিদ্যালয়ভিত্তিক বর্ণমালায় অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ—এই এগারোটি স্বরবর্ণ শেখানো হয়। এটি লিখিত স্বরবর্ণের তালিকা; কথ্য স্বরধ্বনি গোনার তালিকা নয়। আধুনিক ধ্বনিতাত্ত্বিক আলোচনায় মৌলিক স্বর, নাসিক্য স্বর ও দ্বিস্বরের গণনা পৃথকভাবে করা হয়। অঞ্চল ও বিশ্লেষণভেদে বর্ণনা বদলাতে পারে। একই পাঠে দ্বিস্বরের সংখ্যা একবার ২৫, অন্যবার ২৭ লিখে কোন বিশ্লেষণ বোঝানো হচ্ছে তা না বলা অনির্ভরযোগ্য। নির্দিষ্ট পাঠ্যবইয়ের গণনা চাইলে তার সংজ্ঞা ও তালিকাসহ উত্তর দিন।
বর্ণ, কার ও যুক্তবর্ণ
‘আ’ স্বাধীন স্বরবর্ণ, আর ‘কা’-এর ‘া’ নির্ভরশীল স্বরচিহ্ন বা আ-কার। একইভাবে ই-কার ও উ-কারের অবস্থান লিখিত শব্দে ভিন্ন। অ-এর জন্য আলাদা কারচিহ্ন নেই। তবে প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের পরে সর্বদা একই অ-ধ্বনি উচ্চারিত হয়—এমন যান্ত্রিক নিয়ম করবেন না।
| লিখিত রূপ | গঠন | কী মনে রাখবেন |
|---|---|---|
| ক্ষ | ক্ + ষ | একটি যুক্তবর্ণ; উচ্চারণ শব্দভেদে দেখুন |
| জ্ঞ | জ্ + ঞ | লিখিত গঠন ও প্রচলিত উচ্চারণ এক করে ধরবেন না |
| ঞ্চ | ঞ্ + চ | প্রথম ব্যঞ্জনের স্বর দমন বোঝাতে হসন্ত গুরুত্বপূর্ণ |
| ষ্ণ | ষ্ + ণ | যুক্তরূপে পৃথক বর্ণের পরিচয় থাকে |
বর্ণের মাথার দাগকে মাত্রা বলা হয়; ছন্দের মাত্রা বা স্বরের স্থায়িত্বের সঙ্গে এটি এক ধারণা নয়। ছাপার অক্ষররীতির সঙ্গে মিলিয়ে পূর্ণমাত্রা, অর্ধমাত্রা ও মাত্রাহীন বর্ণ শিখুন। একই বর্ণকে দুটি তালিকায় রেখে মোট সংখ্যা মেলানো যাবে না।
ঘোষতা ও প্রাণতা বোঝার কাজ
ঘোষধ্বনিতে স্বরতন্ত্রী কম্পিত হয়। অঘোষধ্বনিতে সেই কম্পন থাকে না। অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণের পার্থক্য ব্যঞ্জন উচ্চারণে নিঃশ্বাসের প্রবলতার সঙ্গে যুক্ত। ক্–খ্ ও গ্–ঘ্ শুনিয়ে তুলনা করতে পারেন। শিক্ষক আগে নিজে স্পষ্ট উচ্চারণের নমুনা দিন; শিশুর আঞ্চলিক উচ্চারণকে অক্ষমতা বলবেন না।
একটি নিজস্ব অনুশীলন
বোর্ডে ‘ইট’ ও ‘ঈদ’ লিখুন। প্রথমে শিক্ষার্থীদের বর্ণের বানানভেদ দেখাতে বলুন, তারপর শব্দ দুটি উচ্চারণ করতে বলুন। প্রশ্ন করুন, “দুটি আলাদা চিহ্ন দেখলেই কি দুটি আলাদা দৈর্ঘ্যের স্বর শুনতে পেলাম?” উদ্দেশ্য বানান অস্বীকার করা নয়; বানানের পার্থক্য ও উচ্চারণের বিশ্লেষণ আলাদা করা। এরপর ‘বাক্য’ শব্দের লিখিত চিহ্ন গুনে উচ্চারণের সঙ্গে তুলনা করুন। গোনার আগে বর্ণ, ধ্বনি না উচ্চারণদল—কোনটি চাইছেন তা স্পষ্ট করুন।
নিজেকে যাচাই করুন: ‘ক্ষ’ একটি মুদ্রিত যুক্তরূপ বলে কি একে একটি মৌলিক ব্যঞ্জনবর্ণ ধরব? না; লিখিত গঠন ক্ + ষ। ধ্বনি গোনার প্রশ্ন হলে নির্দিষ্ট শব্দের উচ্চারণ বিশ্লেষণও দরকার।
উৎস ও পরিসর
Sameer ud Dowla Khan: Bengali (Bangladeshi Standard), Journal of the International Phonetic Association, 2010 — একটি নির্দিষ্ট প্রমিত কথ্যরীতির গবেষণাভিত্তিক ধ্বনিবর্ণনা। এটি পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি কথ্যরীতি বা বিদ্যালয়ের বর্ণগণনার বিকল্প নয়। উপরের শ্রেণিকক্ষের অনুশীলনটি এই নিবন্ধের জন্য তৈরি।
