ধ্বনি ও বর্ণ
বাংলা ভাষার ধ্বনি ও বর্ণ (for TET WBTET STET CTET for Freshers and In-Service Teachers)
Published by: TET Sampan Editorial Team
বাগযন্ত্র (Vocal Organs)
মানুষের ফুসফুস থেকে বাতাস বাইরে আসার সময় যেসব অঙ্গের মাধ্যমে ধ্বনি (Sound) সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে একত্রে বাগযন্ত্র বলে।
- প্রধান অঙ্গসমূহ: ফুসফুস, শ্বাসনালি, স্বরতন্ত্রী, জিভ, তালু, ওষ্ঠ (ঠোঁট), দন্ত (দাঁত), মূর্ধা এবং নাসিকারন্ধ্র।
- কাজ: ফুসফুস থেকে আসা বাতাসকে মুখবিবরের বিভিন্ন অংশ আটকে বা সংকুচিত করে নানা ধরনের ধ্বনি তৈরি করে।
ধ্বনি ও এর প্রকারভেদ
বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত যেকোনো অর্থপূর্ণ আওয়াজই হলো ধ্বনি।
- প্রকারভেদ:
- স্বরধ্বনি (Vowel Sound): যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখবিবরে বাতাস কোথাও বাধা পায় না। (যেমন: অ, আ, ই)
- ব্যঞ্জনধ্বনি (Consonant Sound): যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস মুখবিবরের কোথাও না কোথাও বাধা পায়। (যেমন: ক্, খ্, গ্)
স্বরধ্বনি সম্পর্কে মৌলিক তথ্য
| বিষয় | সঠিক সংখ্যা | বর্ণ/ধ্বনিসমূহ |
|---|---|---|
| মোট স্বরবর্ণ | ১১টি | অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ |
| মৌলিক স্বরধ্বনি | ৭টি | /অ/, /আ/, /ই/, /উ/, /এ/, /ও/, /অ্যা/ |
| যৌগিক স্বরবর্ণ | ২টি | ঐ (ও + ই), ঔ (ও + উ) |
| যৌগিক স্বরধ্বনি | ২৫টি | যেমন: আই, আও, উই ইত্যাদি (বর্ণ রূপ মাত্র ২টি) |
| কার চিহ্ন | ১০টি | া, ি, ী, ু, ূ, ৃ, ে, ৈ, ো, ৌ |
| লীন বর্ণ / অবিলীন স্বর | ১টি | 'অ' (এর নিজস্ব কোনো কার চিহ্ন নেই) |
উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী স্বরধ্বনি
জিভ ও মুখের অবস্থানের ভিত্তিতে স্বরধ্বনির স্থান নির্ধারিত হয়:
- জিহ্বামূলীয়/কণ্ঠ্য: অ, আ
- তালব্য: ই, ঈ
- ওষ্ঠ্য: উ, ঊ
- মূর্ধন্য: ঋ
- কণ্ঠতালব্য: এ, ঐ
- কণ্ঠোষ্ঠ্য: ও, ঔ
বাংলা স্বরবর্ণের শ্রেণীবিন্যাস নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো:
| স্বরবর্ণের শ্রেণীবিভাগ | উপবিভাগ | অন্তর্ভুক্ত স্বরবর্ণ / স্বরধ্বনি | বৈশিষ্ট্য / উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| উচ্চারণ-কালের তারতম্য অনুযায়ী | হ্রস্বস্বর | অ, ই, উ, ঋ | উচ্চারণে কম সময় লাগে (সংস্কৃত মতে ১ মাত্রা) |
| দীর্ঘস্বর | আ, ঈ, ঊ, এ, ঐ, ও, ঔ | উচ্চারণে বেশি সময় লাগে (সংস্কৃত মতে ২ মাত্রা) | |
| বিশেষ উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী | প্লুতস্বর | যেকোনো বিলম্বিত স্বরধ্বনি | গানে, রোদনে বা দূর থেকে আহ্বানে বিলম্বিত স্বর (যেমন: অরু-উ-উ-ণ) |
| যৌগিক স্বর | ঐ (অই/ওই), ঔ (অউ/ওউ) | পাশাপাশি দুটি স্বরধ্বনি একসঙ্গে উচ্চারিত হলে (বাংলায় মোট ২৭টি যৌগিক স্বরধ্বনি আছে) | |
| জিহ্বা ও ওষ্ঠের অবস্থান অনুযায়ী | সম্মুখ স্বরধ্বনি | ই, এ, অ্যা, আ' | উচ্চারণের সময় জিহ্বা সামনের দিকে অগ্রসর হয় (প্রসারিত স্বর) |
| পশ্চাৎ স্বরধ্বনি | উ, ও, অ, আ | উচ্চারণের সময় জিহ্বা পিছনের দিকে পিছিয়ে যায় (কুঞ্চিত স্বর) | |
| জিহ্বার উচ্চতা অনুযায়ী | উচ্চ স্বরধ্বনি | ই, উ | উচ্চারণকালে জিহ্বা সর্বাগ্রে উচ্চে অবস্থান করে |
| উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি | এ, ও | জিহ্বা উচ্চ স্বরধ্বনি থেকে সামান্য নিচে থাকে | |
| নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি | অ্যা, অ | জিহ্বা নিম্ন স্বরধ্বনি থেকে সামান্য ওপরে থাকে | |
| নিম্ন স্বরধ্বনি | আ, আ' | উচ্চারণকালে জিহ্বা সর্বনিম্ন অবস্থানে শায়িত থাকে | |
| মুখবিবরের উন্মুক্ততা অনুযায়ী | সংবৃত স্বরধ্বনি | ই, উ | উচ্চারণকালে মুখগহ্বর খুব বেশি সঙ্কুচিত হয় |
| অর্ধ-সংবৃত স্বরধ্বনি | এ, ও | মুখগহ্বর ও ওষ্ঠদ্বয় অল্প সঙ্কুচিত থাকে | |
| অর্ধ-বিবৃত স্বরধ্বনি | অ্যা, অ | মুখগহ্বর অধোমুক্ত বা আংশিক খোলা থাকে | |
| বিবৃত স্বরধ্বনি | আ | উচ্চারণকালে মুখগহ্বর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকে |
বর্ণ ও এর প্রকারভেদ
ধ্বনিকে লিখে প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত সাংকেতিক চিহ্ন বা রূপকে বর্ণ বলে।
- স্বরবর্ণ (১১টি): স্বরধ্বনির লিখিত রূপ (অ থেকে ঔ)।
- ব্যঞ্জনবর্ণ (৩৯টি): ব্যঞ্জনধ্বনির লিখিত রূপ (ক থেকে ঁ)।
মাত্রা ও মাত্রা অনুযায়ী বর্ণের প্রকারভেদ
বর্ণের মাথার ওপর দেওয়া সোজা দাগকে মাত্রা বলে। বাংলা বর্ণমালায় মাত্রা অনুযায়ী বর্ণ ৩ প্রকার:
- পূর্ণমাত্রা (৩২টি): অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ক, ঘ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, দ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, ষ, স, হ, ড়, ঢ়।
- অর্ধমাত্রা (৮টি): ঋ, খ, গ, ণ, থ, ধ, প, শ।
- মাত্রাহীন (১০টি): এ, ঐ, ও, ঔ, ঙ, ঞ, ৎ, ং, ঃ, ঁ।
ধ্বনি ও বর্ণের পার্থক্য
- ধ্বনি শ্রুতিগ্রাহ্য (কানে শোনা যায়), কিন্তু বর্ণ দৃষ্টিগ্রাহ্য (চোখে দেখা যায়)।
- ধ্বনি হলো ভাষার উচ্চারিত রূপ, আর বর্ণ হলো ধ্বনির লিখিত রূপ।
বাংলা বর্ণমালা
কোনো নির্দিষ্ট ভাষায় ব্যবহৃত সমস্ত বর্ণকে সাজানো সমষ্টিকে বর্ণমালা বলে। বাংলা বর্ণমালায় মোট ৫০টি বর্ণ রয়েছে (১১টি স্বরবর্ণ + ৩৯টি ব্যঞ্জনবর্ণ)।
বর্ণ ও অক্ষরের (Syllable) পার্থক্য
- বর্ণ: ধ্বনির লিখিত সাংকেতিক চিহ্ন (যেমন: 'ক', 'খ')।
- অক্ষর (Syllable): এক ঝোঁকে বা একবারে উচ্চারিত শব্দের ক্ষুদ্রতম অংশ (যেমন: 'প্রভাত' শব্দটিতে ২টি অক্ষর রয়েছে— 'প্র' এবং 'ভাত')।
স্পর্শধ্বনি ও এর প্রকারভেদ
'ক' থেকে 'ম' পর্যন্ত ২৫টি ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ মুখের কোনো না কোনো স্পর্শস্থান স্পর্শ করে। এগুলোকে ৫টি বর্গে ভাগ করা হয়:
- ক-বর্গ (কণ্ঠ্য): ক, খ, গ, ঘ, ঙ
- চ-বর্গ (তালব্য): চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
- ট-বর্গ (মূর্ধন্য): ট, ঠ, ড, ঢ, ণ
- ত-বর্গ (দন্ত্য): ত, থ, দ, ধ, ন
- প-বর্গ (ওষ্ঠ্য): প, ফ, ব, ভ, ম
অনুনাসিক বা নাসিক্য ধ্বনি
যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস প্রধানত নাক দিয়ে বের হয়।
- উদাহরণ (৫টি): ঙ, ঞ, ণ, ন, ম।
অন্যান্য বিশেষ ধ্বনিসমূহ
- তাড়নজাত ধ্বনি: ড়, ঢ় (জিভের ডগা তালুতে আঘাত করে)।
- কম্পনজাত ধ্বনি: র (জিভের ডগা কেঁপে ওঠে)।
- পার্শ্বিক ধ্বনি: ল (বাতাস জিভের দুই পাশ দিয়ে বের হয়)।
- পরাশ্রয়ী বর্ণ: ং, ঃ, ঁ (অন্য বর্ণ ছাড়া একা ব্যবহৃত হতে পারে না)।
অঘোষ ও ঘোষ, অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ (সংজ্ঞা)
- অঘোষ: স্বরতন্ত্রী কম্পিত হয় না।
- ঘোষ: স্বরতন্ত্রী কম্পিত হয়।
- অল্পপ্রাণ: বাতাসে চাপের পরিমাণ কম থাকে।
- মহাপ্রাণ: বাতাসে চাপের পরিমাণ বেশি থাকে ও 'হ' ভাব থাকে।
ব্যঞ্জনধ্বনির বৈচিত্র্যময় শ্রেণিবিভাগ (ছক)
| বর্গ | অঘোষ অল্পপ্রাণ | অঘোষ মহাপ্রাণ | ঘোষ অল্পপ্রাণ | ঘোষ মহাপ্রাণ | নাসিক্য |
|---|---|---|---|---|---|
| ক-বর্গ | ক | খ | গ | ঘ | ঙ |
| চ-বর্গ | চ | ছ | জ | ঝ | ঞ |
| ট-বর্গ | ট | ঠ | ড | ঢ | ণ |
| ত-বর্গ | ত | থ | দ | ধ | ন |
| প-বর্গ | প | ফ | ব | ভ | ম |
ব্যঞ্জনবর্ণের মাত্রাভেদ:
- পূর্ণমাত্রা (২৬টি): ক, খ, গ, ঘ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, ষ, স
- অর্ধমাত্রা (৭টি): খ, গ, ণ, থ, ধ, প, শ
- মাত্রাহীন (৬টি): ঙ, ঞ, ৎ, ং, ঃ, ঁ
বর্গীয় বর্ণের উচ্চারণগত শ্রেণিবিভাগ
(ক) প্রাণতা অনুযায়ী (বাতাসের চাপ):
- অল্পপ্রাণ (১ম ও ৩য় বর্ণ): উচ্চারণে বাতাসের চাপ কম থাকে—ক, গ, চ, জ, ট, ড, ত, দ, প, ব
- মহাপ্রাণ (২য় ও ৪থ বর্ণ): উচ্চারণে বাতাসের চাপ বেশি থাকে ও 'হ' ভাব যুক্ত হয়—খ, ঘ, ছ, ঝ, ঠ, ঢ, থ, ধ, ফ, ভ
(খ) ঘোষতা অনুযায়ী (গলার স্বরতন্তীর কম্পন):
- অঘোষ (১ম ও ২য় বর্ণ): গলার স্বরতন্ত্রী কাঁপে না—ক, খ, চ, ছ, ট, ঠ, ত, থ, প, ফ
- ঘোষ (৩য়, ৪থ ও ৫ম বর্ণ): গলার স্বরতন্ত্রী কাঁপে—গ, ঘ, ঙ, জ, ঝ, ঞ, ড, ঢ, ণ, দ, ধ, ন, ব, ভ, ম
(গ) নাসিক্য ধ্বনি (বর্গের ৫ম বর্ণ - ৫টি):
উচ্চারণের সময় বাতাস মুখ ও নাক দিয়ে একসাথে বের হয়—ঙ, ঞ, ণ, ন, ম
অন্যান্য বিশেষ ব্যঞ্জনধ্বনি (Direct Questions for Exams)
১. উষ্ম বা শিষ ধ্বনি (৪টি): উচ্চারণে হাওয়া ধরে রাখা যায় এবং 'শিষ' দেওয়ার মতো আওয়াজ হয়—শ, ষ, স, হ (এর মধ্যে 'হ' হলো ঘোষ উষ্ম বর্ণ)।
২. অন্তঃস্থ ধ্বনি (৪টি): স্পর্শ ও উষ্ম ধ্বনির মাঝামাঝি অবস্থান—য, র, ল, ব।
৩. তাড়নজাত ধ্বনি (২টি): জিভের ডগা দিয়ে তালুতে তাড়না বা ধাক্কা দেওয়া হয়—ড়, ঢ়।
৪. কম্পনজাত ধ্বনি (১টি): জিভ কেঁপে ওঠে—র।
৫. পার্শ্বিক ধ্বনি (১টি): বাতাস জিভের দুপাশ দিয়ে বের হয়ে যায়—ল।
৬. পরাশ্রয়ী বা অযোগবাহ বর্ণ (৩টি): অন্য বর্ণের ওপর নির্ভর করা ছাড়া একা বসতে পারে না—ং, ঃ, ঁ।
৭. হসন্তযুক্ত ত (`ৎ`): এটি মূলত 'ত' বর্ণের খণ্ড রূপ (খণ্ড ত)।
যুক্তবর্ণ / সংযুক্ত বর্ণের তালিকা (প্রধান কয়েকটি)
দুটি বা তার বেশি ব্যঞ্জনবর্ণ একত্রে যুক্ত হয়ে যুক্তবর্ণ তৈরি করে:
- ক্ষ = ক্ + ষ
- জ্ঞ = জ্ + ঞ
- ঞ্চ = ঞ + চ
- হ্ম = হ্ + ম
- ষ্ণ = ষ + ণ
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic