বিকাশের বিভিন্ন দিক (Aspects of Development): পিয়াজের তত্ত্ব (Views of Piaget)
Physical, Social, Emotional, Language and Cognitive development; Views of Piaget for WBTET/CTET in Bengali
Published by: TET Sampan Editorial Team
১. বিকাশের বিভিন্ন দিক (Aspects of Development)
মানব বিকাশকে মূলত পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করে আলোচনা করা হয়। এগুলো একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত (Interconnected):
ক. শারীরিক বিকাশ (Physical Development)
- ধারণা: শিশুর শরীরের আকার, উচ্চতা, ওজন, অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং মস্তিষ্কের কাঠামোগত পরিবর্তনকে শারীরিক বিকাশ বলে।
- প্রকারভেদ: এটি দুই ধরণের সঞ্চালনমূলক দক্ষতার (Motor Skills) সাথে যুক্ত:
- Gross Motor দক্ষতা (স্থূল পেশী সঞ্চালন): বড় পেশীর ব্যবহার, যেমন— হাঁটা, দৌড়ানো, লাফানো।
- Fine Motor দক্ষতা (সূক্ষ্ম পেশী সঞ্চালন): ছোট পেশীর নিখুঁত ব্যবহার, যেমন— লেখা, ছবি আঁকা, সুতোয় পুঁতি গাঁথা।
খ. সামাজিক বিকাশ (Social Development)
- ধারণা: সমাজের নিয়ম-কানুন, রীতিনীতি মেনে চলা এবং অন্য মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতাই হলো সামাজিক বিকাশ।
- বৈশিষ্ট্য: এটি শিশুর সামাজিকীকরণ (Socialization) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। এর ফলে শিশুর মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা (Empathy) এবং দলগত মনোভাব তৈরি হয়।
গ. প্রাক্ষোভিক বা আবেগীয় বিকাশ (Emotional Development)
- ধারণা: নিজের আবেগকে (যেমন— আনন্দ, ভয়, রাগ, ভালোবাসা) চেনা, সঠিকভাবে প্রকাশ করা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাই হলো প্রাক্ষোভিক বিকাশ (Emotional Development)।
- বৈশিষ্ট্য: শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে ওঠে সুস্থ প্রাক্ষোভিক বিকাশের মাধ্যমে।
ঘ. ভাষার বিকাশ (Language Development)
- ধারণা: নিজের মনের ভাব প্রকাশের জন্য শব্দ, বাক্য এবং ভাষার ব্যাকরণগত নিয়ম আয়ত্ত করার প্রক্রিয়াকে ভাষার বিকাশ বলে।
- ধারা: এটি সাধারণত কান্না $\rightarrow$ কুয়িং (Cooing) $\rightarrow$ বাবলিং (Babbling) $\rightarrow$ এক-শব্দের স্তর (One-word stage) $\rightarrow$ দ্বি-শব্দের স্তর (Telegraphic speech)- এভাবে এগোয়।
ঙ. জ্ঞানীয় বা বৌদ্ধিক বিকাশ (Cognitive Development)
- ধারণা: চিন্তাভাবনা করা, যুক্তি দেওয়া, সমস্যা সমাধান করা, স্মৃতিশক্তি এবং মনোযোগের মতো মানসিক ক্ষমতার বিকাশই হলো জ্ঞানীয় বিকাশ।
- উৎস: শিশু কীভাবে বাইরের জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করে এবং ধারণা (Concept) গঠন করে, তা এই বিকাশের অন্তর্ভুক্ত।
সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক জঁ পিয়াজে (Jean Piaget) শিশুর জ্ঞানীয় বা বৌদ্ধিক বিকাশ নিয়ে যে যুগান্তকারী তত্ত্বটি দিয়েছিলেন, তা মনস্তত্ত্বে "প্রজ্ঞামূলক বা জ্ঞানীয় বিকাশ তত্ত্ব" (Cognitive Development Theory) নামে পরিচিত। পিয়াজে নিজেকে একজন 'জৈব-প্রজ্ঞামূলক তত্ত্ববিদ' (Genetic Epistemologist) বলতেন।
নিচে তাঁর তত্ত্বের প্রধান ধারণাগুলি ব্যাখ্যা করা হলো:
১. পিয়াজের তত্ত্বের মূল দার্শনিক ভিত্তি
- খুদে বিজ্ঞানী (Little Scientists): পিয়াজে বিশ্বাস করতেন, শিশুরা নিষ্ক্রিয়ভাবে কোনো তথ্য গ্রহণ করে না। তারা হলো "খুদে বিজ্ঞানী", যারা পরিবেশের সাথে সক্রিয় মিথস্ক্রিয়া করে এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজেদের জ্ঞান নিজে তৈরি করে। এই কারণে তাঁর তত্ত্বকে গঠনবাদ (Constructivism) বলা হয়।
- পর্যায়ভিত্তিক বা বিচ্ছিন্ন বিকাশ (Discontinuous Development): পিয়াজের মতে, শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি কতগুলো সুনির্দিষ্ট এবং ভিন্ন ভিন্ন স্তরের (Stages) মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে এগোয়।
২. জ্ঞানীয় সংগঠনের মূল উপাদানসমূহ (Structural Elements)
পিয়াজে মানুষের চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ধারণার অবতারণা করেছেন:
ক. স্কিমা (Schema)
- ধারণা: কোনো মুহূর্তে অর্জিত তথ্যের একক বা চিন্তার সংগঠিত রূপ হলো স্কিমা। এটি হলো আমাদের মনের ভেতরের এক একটি "ধারণার ফাইল" বা পকেট। মানুষ অভিজ্ঞতার সাথে সাথে এই স্কিমা সম্প্রসারণ করে।
- উদাহরণ: একটি শিশু প্রথমবার চার পা ওয়ালা একটি বিড়াল দেখে তার মাথায় "বিড়াল মানে চার পা, দুটি কান ও একটি লেজ বিশিষ্ট প্রাণী"—এই ধারণার যে ফাইলটি তৈরি করল, সেটাই তার বিড়ালের স্কিমা।
খ. অভিযোজন (Adaptation)
পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার সার্বিক প্রক্রিয়াকে অভিযোজন বলে। এর দুটি উপপ্রক্রিয়া রয়েছে:
- ১. আত্মীকরণ (Assimilation): নতুন কোনো তথ্য বা অভিজ্ঞতাকে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সরাসরি মনের পুরনো স্কিমার মধ্যে যুক্ত করা।
- উদাহরণ: ওই শিশুটি যখন পরে একটি কুকুরছানা দেখে তার চার পা ও লেজ দেখে তাকেও "বিড়াল" বলে ডাকে, তখন সে নতুন তথ্যকে পুরনো স্কিমায় আত্মীকরণ করে।
- ২. সহযোজন (Accommodation): যখন নতুন অভিজ্ঞতা পুরনো স্কিমার সাথে মেলে না, তখন পুরনো স্কিমাকে সংশোধন বা পরিবর্তন করে নতুন স্কিমা তৈরি করার প্রক্রিয়া।
- Ref: আগের উদাহরণে, যখন কুকুরটি 'ঘেউ ঘেউ' করে ডাকে, তখন শিশুর মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মা যখন বলেন এটা কুকুর, তখন শিশু তার পুরনো স্কিমা সংশোধন করে "কুকুর" নামে নতুন স্কিমা তৈরি করে।
গ. সাম্যাবস্থা (Equilibration) & অসমতা (Disequilibrium)
- অসমতা: নতুন তথ্য যখন পুরনো স্কিমার সাথে মেলে না, তখন মনের মধ্যে যে বিভ্রান্তি বা মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়, তাকে প্রাক্ষোভিক অসঙ্গতি বা Disequilibrium বলে।
সহজ বাস্তব উদাহরণ: একটি শিশু প্রথমবার আকাশে উড়োজাহাজ দেখে সেটিকে বড় কোনো "পাখি" ভেবে ভুল করার পর, যখন দেখে সেটি ডানা নাড়ছে না বা যান্ত্রিক শব্দ করছে, তখন তার মনের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ও খটকা তৈরি হয়, তা-ই হলো অসমতা।
- সাম্যাবস্থা: আত্মীকরণ এবং সহযোজনের মাধ্যমে সেই বিভ্রান্তি দূর করে মনের মধ্যে আবার চিন্তার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াই হলো Equilibration।
সহজ বাস্তব উদাহরণ: যখন বুঝিয়ে বলেন ওটি আসলে লোহার তৈরি উড়োজাহাজ, তখন শিশুটি নিজের ভুল সংশোধন করে নতুন একটি ধারণা তৈরি করে এবং মনের সব বিভ্রান্তি দূর করে যে মানসিক ভারসাম্য বা স্বস্তি ফিরে পায়, তা-ই হলো সাম্যবস্থা।
৩. জ্ঞানীয় বিকাশের চারটি প্রধান স্তর (Four Stages of Development)
পিয়াজের মতে, প্রতিটি শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিচে দেওয়া ৪টি স্তর মেনে ক্রমান্বয়ে ঘটে:
১. সংবেদন-সঞ্চালনমূলক স্তর (Sensory-Motor Stage) | বয়স: ০ থেকে ২ বছর
এই স্তরে শিশু তার ইন্দ্রিয় (দেখা, শোনা, স্পর্শ) এবং পেশী সঞ্চালনের (হাত-পা নাড়া) মাধ্যমে বাইরের জগৎকে চেনে।
- বস্তুর স্থায়িত্ববোধ (Object Permanence): এই স্তরের প্রধান বৈশিষ্ট্য। স্তরের শুরুতে (যেমন ৮ মাস বয়সে) শিশুর চোখের সামনে থেকে খেলনা লুকিয়ে রাখলে সে খোঁজে না, কারণ সে ভাবে যা দেখা যাচ্ছে না তার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু ২ বছর বয়সের মধ্যে শিশু বোঝে যে চোখের আড়াল হলেও বস্তুর অস্তিত্ব থাকে।
- লক্ষ্য-অভিমুখী আচরণ (Goal-directed behavior): শিশু নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে এগিয়ে যায় বা হাত বাড়ায়।
২. প্রাক-সক্রিয়তার স্তর (Pre-Operational Stage) | বয়স: ২ থেকে ৭ বছর
এই স্তরে ভাষার দ্রুত বিকাশ ঘটে এবং শিশু প্রতীকের ব্যবহার শেখে। তবে এই স্তরের চিন্তাভাবনায় কিছু যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা থাকে:
- আত্মকেন্দ্রিকতা (Egocentrism): শিশু মনে করে সে যেভাবে পৃথিবীটাকে দেখছে বা ভাবছে, বাকি সবাই ঠিক সেভাবেই দেখছে। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতা তার থাকে না।
- সর্বপ্রাণবাদ (Animism): জড় বস্তুকেও সজীব বা প্রাণবন্ত মনে করা (যেমন: মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে মেঝেটিকে লাঠি দিয়ে মারলে শিশুটি শান্ত হয়)।
- অপরিবর্তনীয়তা (Irreversibility): চিন্তাভাবনা উল্টো দিক থেকে ভাবতে পারে না (যেমন: বরফ গলে জল হয় বুঝলেও, জল জমে যে আবার বরফ হতে পারে, তা বোঝে না)।
- কেন্দ্রিকতা (Centration): কোনো বস্তুর একাধিক বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর না দিয়ে কেবল একটিমাত্র বৈশিষ্ট্যের ওপর মনোযোগ দেওয়া।
৩. মূর্ত-সক্রিয়তার স্তর (Concrete Operational Stage) | বয়স: ৭ থেকে ১১ বছর
এই স্তরে শিশুর চিন্তাভাবনায় প্রকৃত যুক্তির উদয় হয়, তবে তা কেবল মূর্ত বা চোখের সামনে থাকা প্রত্যক্ষ বস্তুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে।
- সংরক্ষণ (Conservation): বস্তুর বাহ্যিক আকার বা পাত্রের পরিবর্তন হলেও তার ভেতরের আসল পরিমাণ বা আয়তন একই থাকে—এই বোধ তৈরি হয় (যেমন: চওড়া খাটো গ্লাস ও লম্বা সরু গ্লাসে সমান জল থাকার ধারণা)।
- বিপরীতমুখীনতা (Reversibility): চিন্তাকে উল্টো দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয় (যেমন: $A > B$ হলে $B < A$ এটা বুঝতে পারে)।
- শ্রেণীকরণ (Classification) ও ক্রমপর্যায় (Seriation): আকার বা গুণ অনুযায়ী বস্তুকে ছোট থেকে বড় সাজানো বা দলভুক্ত করার ক্ষমতা আসে।
৪. যৌথ বা আনুষ্ঠানিক সক্রিয়তার স্তর (Formal Operational Stage) | বয়স: ১১ থেকে ১৫/১৮ বছর
এটি জ্ঞানীয় বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর। এখানে কিশোর-কিশোরীরা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো চিন্তা করতে সক্ষম হয়।
- বিমূর্ত চিন্তন (Abstract Thinking): যা চোখে দেখা যায় না (যেমন— ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সততা, গণিতের জটিল সমীকরণ), তা নিয়ে অবলীলায় যুক্তিপূর্ণ চিন্তা করতে পারে।
- কাল্পনিক অবরোহী যুক্তি (Hypothetico-Deductive Reasoning): কোনো সমস্যার সমাধান করার জন্য আগে থেকে মনে মনে সম্ভাব্য অনুমান বা হাইপোথিসিস তৈরি করতে পারে এবং তা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করতে পারে।
৪. পিয়াজের তত্ত্বে ভাষার ভূমিকা ও সমালোচনা
- ভাষা ও চিন্তন: পিয়াজে মনে করতেন, চিন্তা ভাষা তৈরি করে বা চিন্তন আগে আসে, ভাষা পরে (Thought precedes Language)। তিনি শিশুর নিজের সাথে নিজে জোরে কথা বলাকে 'আত্মকেন্দ্রিক কথন' (Egocentric Speech) বলেছেন এবং একে প্রজ্ঞামূলক বিকাশের ক্ষেত্রে নিরর্থক বা অপরিপক্বতার লক্ষণ মনে করেছেন (যেখানে ভাইগটস্কি একে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন)।
- সমালোচনা: আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, পিয়াজে শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে সমাজ, সংস্কৃতি এবং পরিবেশের ভূমিকাকে অবহেলা করেছেন। এছাড়াও, তিনি শিশুদের ক্ষমতাকে কিছুটা কম মূল্যায়ন করেছিলেন; আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে অনেক শিশু নির্দিষ্ট বয়সের আগেই মূর্ত বা বিমূর্ত চিন্তন করতে সক্ষম হয়।
৫. শিক্ষাক্ষেত্রে এই তত্ত্বের প্রয়োগ (Pedagogical Significance)
১. শিক্ষার্থীর বয়স উপযোগী পাঠ্যক্রম: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুকে (প্রাক-সক্রিয়তার স্তর) বর্ণমালা বা সংখ্যা শেখানোর জন্য চার্ট, খেলনা বা মূর্ত প্রতীক ব্যবহার করা উচিত; সরাসরি বিমূর্ত সূত্র দেওয়া যাবে না।
২. আবিষ্কারমূলক শিখন (Discovery Learning): শিক্ষক ক্লাসরুমে জ্ঞান গিলিয়ে দেবেন না, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করবেন যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেরা সক্রিয়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সত্য আবিষ্কার করতে পারে।
৩. Readiness বা মানসিক প্রস্তুতি: শিশু যতক্ষণ না জৈবিকভাবে কোনো স্তর অর্জনের জন্য তৈরি (Ready) হচ্ছে, ততক্ষণ তাকে জোর করে কঠিন বিষয় শেখানো যাবে না।
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
08. বিকাশের বিভিন্ন দিক : পিয়াজের তত্ত্ব — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic