কোম্পানি শাসনের প্রতিষ্ঠা
বাণিজ্য থেকে কোম্পানি শাসন, পলাশি, বক্সার, দেওয়ানি, মহীশূর–মারাঠা যুদ্ধ, অধীনতামূলক মিত্রতা ও সংযুক্তি নীতির সারণি-সমৃদ্ধ বাংলা আলোচনা।
Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team
কোম্পানি শাসনের প্রতিষ্ঠা
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি 1600 সালে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথের সনদ পেয়ে পূর্বদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার লাভ করে। ভারতে এসে কোম্পানি প্রথমে বন্দর ও বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় দুর্বলতা, আঞ্চলিক রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইউরোপীয় বাণিজ্যিক শক্তির সংঘর্ষ এবং কোম্পানির সামরিক–আর্থিক সংগঠনের ফলে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক শাসকে পরিণত হয়।
বাণিজ্য থেকে শাসনের ধারাচিত্র
রাজকীয় সনদ → বাণিজ্যকুঠি ও বন্দর → দুর্গ ও নিজস্ব সৈন্য → স্থানীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ → যুদ্ধ ও সন্ধি (Sandhi) → রাজস্বের অধিকার → ভূখণ্ড ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ
প্রধান ঘটনাবলির সময়রেখা
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| 1600 | ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজকীয় সনদ |
| 1612 | স্বালির নৌযুদ্ধের পরে সুরাটে ইংরেজ অবস্থান শক্তিশালী |
| 1639 | মাদ্রাজপত্তনমে ফোর্ট সেন্ট জর্জের ভিত্তি |
| 1668 | বোম্বে কোম্পানির হাতে হস্তান্তর |
| 1690-এর দশক | কলকাতা অঞ্চলে কোম্পানির বসতি ও ফোর্ট উইলিয়াম |
| 1717 | সম্রাট ফাররুখসিয়ারের ফরমান; কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা |
| 1757 | পলাশির যুদ্ধ |
| 1764 | বক্সারের যুদ্ধ |
| 1765 | বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ |
| 1773 | নিয়ন্ত্রণ আইন; বাংলার গভর্নর হন গভর্নর-জেনারেল |
| 1784 | পিটের ভারত আইন; ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি |
| 1793 | চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত |
| 1799 | চতুর্থ ইঙ্গ–মহীশূর যুদ্ধ; টিপু সুলতানের মৃত্যু |
| 1818 | তৃতীয় ইঙ্গ–মারাঠা যুদ্ধের অবসান; কোম্পানির প্রাধান্য |
| 1849 | পাঞ্জাব সংযুক্তি |
| 1856 | আওধ সংযুক্তি |
কোম্পানির প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র
| প্রেসিডেন্সি | প্রাথমিক কেন্দ্র | প্রধান দুর্গ | গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য |
|---|---|---|---|
| বাংলা | কলকাতা | ফোর্ট উইলিয়াম | সুতিবস্ত্র, রেশম, লবণশোরা, নীল ও আফিম |
| মাদ্রাজ | মাদ্রাজ | ফোর্ট সেন্ট জর্জ | করোমণ্ডল বস্ত্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বাণিজ্য |
| বোম্বে | বোম্বে | বোম্বে দুর্গাঞ্চল | আরব সাগর, তুলা ও পশ্চিম উপকূলীয় বাণিজ্য |
‘প্রেসিডেন্সি’ ছিল কোম্পানির একটি বৃহৎ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক অঞ্চল। পরে বাংলা, মাদ্রাজ ও বোম্বে প্রেসিডেন্সি কোম্পানি শাসনের প্রধান ভিত্তি হয়।
ইউরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
| শক্তি | প্রধান ভারতীয় কেন্দ্র |
|---|---|
| পর্তুগিজ | গোয়া, দমন ও দিউ |
| ডাচ | পুলিকট, নাগাপট্টনম, কোচিন ও চিনসুরা |
| ইংরেজ | সুরাট, মাদ্রাজ, বোম্বে ও কলকাতা |
| ফরাসি | পন্ডিচেরি, চন্দননগর, মাহে ও কারাইকাল |
| ডেনিশ | ত্রাঙ্কেবার ও শ্রীরামপুর |
ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি ভারতীয় বস্ত্র, মসলা, রেশম, নীল ও লবণশোরার জন্য প্রতিযোগিতা করত। দুর্গ, জাহাজ, ঋণ, স্থানীয় বণিক এবং রাজদরবারের অনুমতি তাদের বাণিজ্যের অংশ ছিল।
কর্নাটকের যুদ্ধ
দক্ষিণ ভারতে ইংরেজ ও ফরাসি কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বিতা কর্নাটকের তিনটি যুদ্ধে প্রকাশ পায়। ইউরোপের যুদ্ধ, হায়দরাবাদ ও কর্নাটকের উত্তরাধিকারসংঘর্ষ এবং কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ একত্রে কাজ করেছিল।
| যুদ্ধ | সময় | প্রধান ফল |
|---|---|---|
| প্রথম কর্নাটক যুদ্ধ | 1746–1748 | ইউরোপের অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের ভারতীয় পর্ব; মাদ্রাজ সাময়িকভাবে ফরাসি দখলে |
| দ্বিতীয় কর্নাটক যুদ্ধ | 1749–1754 | স্থানীয় উত্তরাধিকাররাজনীতিতে ইংরেজ–ফরাসি হস্তক্ষেপ |
| তৃতীয় কর্নাটক যুদ্ধ | 1758–1763 | ওয়ান্ডিওয়াশে ফরাসি পরাজয়; ইংরেজ রাজনৈতিক প্রাধান্য |
1760 সালের ওয়ান্ডিওয়াশের যুদ্ধে আয়ার কুটের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনী কাউন্ট দ্য লালির ফরাসি বাহিনীকে পরাজিত করে। 1763 সালের প্যারিস সন্ধির পরে ফরাসিরা বাণিজ্যকেন্দ্র রাখলেও বৃহৎ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলার বাণিজ্যিক গুরুত্ব
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা ছিল কৃষি (Agriculture), বস্ত্র, রেশম ও নদীবাণিজ্যে সমৃদ্ধ অঞ্চল। মুর্শিদাবাদ ছিল নবাবি রাজধানী; ঢাকা সূক্ষ্ম মসলিনের জন্য পরিচিত; কাশিমবাজার রেশম ও বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র; হুগলি নদীপথ কলকাতাকে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করত।
| কেন্দ্র | গুরুত্ব |
|---|---|
| মুর্শিদাবাদ | নবাবি রাজধানী, রাজস্ব ও ব্যাংকারদের কেন্দ্র |
| ঢাকা | মসলিন ও সুতিবস্ত্র |
| কাশিমবাজার | রেশম ও কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি |
| হুগলি | নদীবন্দর ও ইউরোপীয় বসতি |
| কলকাতা | ফোর্ট উইলিয়াম, কোম্পানি দপ্তর ও বন্দর |
ফরমান ও দস্তক
1717 সালে মুঘল সম্রাট ফাররুখসিয়ারের ফরমান কোম্পানিকে বাংলায় কিছু শুল্কসুবিধা দেয়। কোম্পানির অনুমতিপত্রকে দস্তক বলা হত। কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত বাণিজ্যেও দস্তক ব্যবহার করলে নবাবের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভারতীয় বণিকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন।
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| ফরমান | সম্রাটের সরকারি আদেশ |
| দস্তক | কোম্পানির শুল্কমুক্ত পণ্য চলাচলের অনুমতিপত্র |
| বাণিজ্যকুঠি | গুদাম, দপ্তর ও কর্মচারীদের বাণিজ্যকেন্দ্র; উৎপাদনকারী কারখানা নয় |
| গোমস্তা | কোম্পানির ক্রয়, অগ্রিম ও তাঁতি নিয়ন্ত্রণকারী ভারতীয় প্রতিনিধি |
সিরাজউদ্দৌলা ও কোম্পানির সংঘর্ষ
আলিবর্দি খানের মৃত্যুর পরে 1756 সালে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কলকাতার দুর্গ মজবুত করা, শুল্কসুবিধার অপব্যবহার, নবাবের বিরোধীদের আশ্রয় এবং কোম্পানির ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতা সংঘর্ষের কারণ হয়। সিরাজ কলকাতা দখল করেন; কোম্পানি মাদ্রাজ থেকে রবার্ট ক্লাইভ ও নৌবাহিনী পাঠিয়ে কলকাতা পুনর্দখল করে।
পলাশির যুদ্ধ
1757 সালের 23 জুন ভাগীরথীর তীরে পলাশিতে নবাবের বাহিনী ও কোম্পানির মধ্যে যুদ্ধ হয়। কোম্পানি মিরজাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ ও নবাবের দরবারের অন্য বিরোধীদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করেছিল। মিরজাফরের বাহিনী যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থাকে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সাল ও তারিখ | 23 জুন 1757 |
| স্থান | পলাশি, ভাগীরথী নদীর তীর |
| নবাব | সিরাজউদ্দৌলা |
| কোম্পানির নেতৃত্ব | রবার্ট ক্লাইভ |
| ষড়যন্ত্রের প্রধান সুবিধাভোগী | মিরজাফর |
| ফল | সিরাজের পরাজয়; মিরজাফর নবাব; কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্পদ বৃদ্ধি |
পলাশি ছিল সীমিত সামরিক সংঘর্ষ, কিন্তু দরবারি ষড়যন্ত্র ও অর্থনৈতিক চুক্তির কারণে তার রাজনৈতিক ফল ছিল ব্যাপক। কোম্পানি নবাব নির্বাচন, উপহার, জমি ও বাণিজ্যসুবিধায় সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে।
পলাশির পর
মিরজাফর কোম্পানির বিপুল অর্থদাবি পূরণে সমস্যায় পড়েন। 1760 সালে কোম্পানি তাঁকে সরিয়ে জামাতা মিরকাশিমকে নবাব করে। মিরকাশিম বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম কোম্পানিকে দেন, পরে রাজধানী মুঙ্গেরে সরিয়ে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন সংস্কারের চেষ্টা করেন।
কোম্পানির শুল্কমুক্তি + কর্মচারীর ব্যক্তিগত বাণিজ্য → নবাবের রাজস্বক্ষতি → মিরকাশিমের সকল বণিকের শুল্ক বিলোপ → কোম্পানির বিরোধ → যুদ্ধ
বক্সারের যুদ্ধ
1764 সালের 22 অক্টোবর বক্সারে কোম্পানির বাহিনী মিরকাশিম, আওধের নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে। হেক্টর মনরো কোম্পানির সেনাপতি ছিলেন।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সাল ও তারিখ | 22 অক্টোবর 1764 |
| কোম্পানির সেনাপতি | হেক্টর মনরো |
| বিরোধী জোট | মিরকাশিম, সুজাউদ্দৌলা ও দ্বিতীয় শাহ আলম |
| ফল | কোম্পানির সামরিক মর্যাদা বৃদ্ধি; 1765 সালের রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথ |
পলাশি কোম্পানিকে বাংলার দরবারে প্রভাব দেয়; বক্সার বাংলা–বিহার–ওড়িশা এবং উত্তর ভারতের রাজনীতিতে কোম্পানির সামরিক প্রাধান্য সুদৃঢ় করে।
এলাহাবাদের সন্ধি ও দেওয়ানি
1765 সালে রবার্ট ক্লাইভ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ও আওধের নবাবের সঙ্গে এলাহাবাদের বন্দোবস্ত করেন। সম্রাট কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি—অর্থাৎ রাজস্ব আদায় ও দেওয়ানি বিচারসংক্রান্ত অধিকার—প্রদান করেন।
| পক্ষ | বন্দোবস্তের প্রধান দিক |
|---|---|
| কোম্পানি | বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি; রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ |
| দ্বিতীয় শাহ আলম | বার্ষিক অর্থপ্রাপ্তি; কোরা ও এলাহাবাদ |
| সুজাউদ্দৌলা | ক্ষতিপূরণ দিয়ে আওধ ফেরত; কোম্পানির মিত্র ও প্রতিরোধক অঞ্চল |
| বাংলার নবাব | নামমাত্র নিজামত; বাস্তব অর্থশক্তি কোম্পানির হাতে |
দ্বৈত শাসন
1765 থেকে 1772 পর্যন্ত বাংলায় দ্বৈত শাসন নামে পরিচিত ব্যবস্থা চলে। কোম্পানির হাতে দেওয়ানি ও রাজস্ব ছিল; নবাবের নামে নিজামত—পুলিশ, ফৌজদারি বিচার ও শৃঙ্খলা—চলত। বাস্তবে কোম্পানি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করলেও প্রশাসনিক দায় নবাবের ওপর চাপাতে পারত।
কোম্পানি: রাজস্ব ও অর্থ → নিয়ন্ত্রণ
নবাব: নামমাত্র নিজামত → পর্যাপ্ত অর্থের অভাব
ফল: ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিচ্ছেদ → প্রশাসনিক সংকট
1772 সালে ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে কোম্পানির প্রত্যক্ষ রাজস্ব প্রশাসন শুরু করেন।
বাংলার সম্পদ ও কোম্পানির বিস্তার
দেওয়ানি থেকে পাওয়া রাজস্ব দিয়ে কোম্পানি ভারতীয় পণ্য কিনতে, সেনাবাহিনীর বেতন দিতে এবং নতুন যুদ্ধ চালাতে পারে। আগে ইংল্যান্ড থেকে রুপো এনে পণ্য কিনতে হত; পরে বাংলার রাজস্বই কোম্পানির ক্রয় ও সামরিক ব্যয়ের প্রধান উৎস হয়।
বাংলার কৃষিজ রাজস্ব → কোম্পানির পণ্য ক্রয় → ইউরোপে রপ্তানি
বাংলার কৃষিজ রাজস্ব → সিপাহি ও সেনাবাহিনী → ভারতীয় রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ → নতুন রাজস্বভূমি
কোম্পানির সেনাবাহিনী
কোম্পানির বাহিনীতে ইউরোপীয় অফিসারের অধীনে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সিপাহি কাজ করতেন। নিয়মিত বেতন, প্রশিক্ষণ, আগ্নেয়াস্ত্র, কামান ও কুচকাওয়াজ বাহিনীকে সংগঠিত করত।
| উপাদান | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| সিপাহি | ভারতীয় পদাতিক সৈনিক |
| ইউরোপীয় অফিসার | নেতৃত্ব, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির উচ্চস্তর |
| ব্যাটালিয়ন | নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈনিকের সংগঠিত বাহিনী |
| কামানবাহিনী | দুর্গ ও খোলা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ |
| নিয়মিত বেতন | রাজস্বের সাহায্যে স্থায়ী সেনা রক্ষা |
| প্রেসিডেন্সি বাহিনী | বাংলা, মাদ্রাজ ও বোম্বের পৃথক সামরিক সংগঠন |
প্রশাসনে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ
কোম্পানির দুর্নীতি, বাংলার প্রশাসনিক সংকট এবং ইংল্যান্ডে আর্থিক সমস্যার কারণে ব্রিটিশ সংসদ (Parliament) কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়।
| আইন | প্রধান বিধান |
|---|---|
| নিয়ন্ত্রণ আইন, 1773 | বাংলার গভর্নর হন গভর্নর-জেনারেল; কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট |
| পিটের ভারত আইন, 1784 | বোর্ড অব কন্ট্রোল; ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক তত্ত্বাবধান |
| সনদ আইন, 1813 | ভারতের সঙ্গে কোম্পানির বাণিজ্য একচেটিয়ার অবসান; চা ও চীন ব্যতিক্রম |
| সনদ আইন, 1833 | কোম্পানির বাণিজ্যিক কাজের সম্পূর্ণ অবসান; প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর |
দেওয়ানি প্রশাসন
ওয়ারেন হেস্টিংস জেলা স্তরে রাজস্ব ও বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন। পরে কর্নওয়ালিস ইউরোপীয় কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ বেতন, দেওয়ানি পরিষেবা এবং আদালতের স্তরবিন্যাসকে শক্তিশালী করেন।
| পদ বা প্রতিষ্ঠান | কাজ |
|---|---|
| কালেক্টর | জেলার রাজস্ব সংগ্রহ; পরে বিস্তৃত প্রশাসনিক ক্ষমতা |
| দেওয়ানি আদালত | সম্পত্তি, ঋণ ও নাগরিক বিরোধ |
| ফৌজদারি আদালত | অপরাধসংক্রান্ত বিচার |
| সদর দেওয়ানি আদালত | উচ্চ দেওয়ানি আপিল আদালত |
| সদর নিজামত আদালত | উচ্চ ফৌজদারি আদালত |
মহীশূরের উত্থান
হায়দর আলি ও টিপু সুলতানের অধীনে মহীশূর দক্ষিণ ভারতের একটি শক্তিশালী সামরিক–রাজস্ব রাষ্ট্রে পরিণত হয়। উন্নত পদাতিক, কামান, রকেট, রেশম ও চন্দনবাণিজ্য, ফরাসি সম্পর্ক এবং মালাবার উপকূলে প্রবেশ কোম্পানির উদ্বেগ বাড়ায়।
| যুদ্ধ | সময় | প্রধান ফল |
|---|---|---|
| প্রথম ইঙ্গ–মহীশূর যুদ্ধ | 1767–1769 | মাদ্রাজ সন্ধি; হায়দর আলির শক্তির স্বীকৃতি |
| দ্বিতীয় ইঙ্গ–মহীশূর যুদ্ধ | 1780–1784 | হায়দর আলির মৃত্যু; ম্যাঙ্গালোর সন্ধি |
| তৃতীয় ইঙ্গ–মহীশূর যুদ্ধ | 1790–1792 | শ্রীরঙ্গপত্তনম সন্ধি; টিপুর অর্ধেক ভূখণ্ড হস্তান্তর |
| চতুর্থ ইঙ্গ–মহীশূর যুদ্ধ | 1799 | শ্রীরঙ্গপত্তনমে টিপুর মৃত্যু; মহীশূরের বড় অংশ কোম্পানি ও মিত্রদের হাতে |
টিপু সুলতান (Sultan)
| ক্ষেত্র | উদ্যোগ |
|---|---|
| সামরিক প্রযুক্তি | লৌহনলযুক্ত মহীশূরী রকেট |
| প্রশাসন | নতুন মুদ্রা, পঞ্জিকা ও দপ্তর |
| বাণিজ্য | রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ও বিদেশে প্রতিনিধি |
| কৃষি ও শিল্প | রেশমচাষ, বাগান ও কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা |
| কূটনীতি | ফরাসি, উসমানীয় ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ (Communication) |
অধীনতামূলক মিত্রতা
গভর্নর-জেনারেল রিচার্ড ওয়েলেসলি অধীনতামূলক মিত্রতা বিস্তৃত করেন। ভারতীয় শাসককে কোম্পানির সৈন্য রাখতে ও তার ব্যয় দিতে হত; অন্য ইউরোপীয়কে চাকরি দেওয়া এবং কোম্পানির অনুমতি ছাড়া বিদেশনীতি পরিচালনা সীমিত হত।
| শর্ত | রাজনৈতিক ফল |
|---|---|
| কোম্পানির সহায়ক বাহিনী | শাসকের সামরিক নির্ভরতা |
| বাহিনীর ব্যয় বা ভূখণ্ড | রাজস্ব ও ভূমির ক্ষতি |
| ব্রিটিশ রেসিডেন্ট | দরবারে কোম্পানির স্থায়ী প্রভাব |
| স্বাধীন কূটনীতির নিষেধ | সার্বভৌমত্ব সংকুচিত |
| নিজস্ব সেনা হ্রাস | অভ্যন্তরীণ বিরোধে কোম্পানির ওপর নির্ভরতা |
হায়দরাবাদ, আওধ, মহীশূর ও বহু মারাঠা শাসক বিভিন্ন সময়ে এই ব্যবস্থার অধীন আসে।
রেসিডেন্ট
রেসিডেন্ট ছিলেন কোনো ভারতীয় রাজদরবারে কোম্পানির রাজনৈতিক প্রতিনিধি। তিনি সন্ধি পর্যবেক্ষণ, সংবাদ সংগ্রহ, উত্তরাধিকার ও নিয়োগে প্রভাব এবং কোম্পানির স্বার্থরক্ষা করতেন। তাঁর উপস্থিতি মিত্র রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও কোম্পানির হস্তক্ষেপ বাড়ায়।
মারাঠা শক্তি
অষ্টাদশ শতাব্দীতে মারাঠা সাম্রাজ্য (Empire) পেশোয়ার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ কাঠামো পায়। পুনের পেশোয়া, গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, ইন্দোরের হোলকর, নাগপুরের ভোঁসলে এবং বরোদার গায়কোয়াড় নিজেদের অঞ্চল পরিচালনা করতেন।
| মারাঠা শক্তি | প্রধান কেন্দ্র |
|---|---|
| পেশোয়া | পুনে |
| সিন্ধিয়া | গোয়ালিয়র |
| হোলকর | ইন্দোর |
| ভোঁসলে | নাগপুর |
| গায়কোয়াড় | বরোদা |
ইঙ্গ–মারাঠা যুদ্ধ
| যুদ্ধ | সময় | প্রধান ফল |
|---|---|---|
| প্রথম ইঙ্গ–মারাঠা যুদ্ধ | 1775–1782 | সালবাই সন্ধি; সাময়িক ভারসাম্য |
| দ্বিতীয় ইঙ্গ–মারাঠা যুদ্ধ | 1803–1805 | সিন্ধিয়া ও ভোঁসলের পরাজয়; ভূখণ্ড ও প্রভাব হারানো |
| তৃতীয় ইঙ্গ–মারাঠা যুদ্ধ | 1817–1818 | পেশোয়া পদ বিলুপ্ত; মারাঠা শক্তিগুলি কোম্পানির অধীনতা স্বীকার |
1802 সালের বাসেইন সন্ধিতে পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও কোম্পানির অধীনতামূলক মিত্রতা গ্রহণ করেন। এটি দ্বিতীয় ইঙ্গ–মারাঠা যুদ্ধের একটি প্রধান কারণ।
শিখ সাম্রাজ্য ও পাঞ্জাব
মহারাজা রণজিৎ সিং বিভিন্ন শিখ মিসলকে একত্র করে পাঞ্জাবে শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। 1799 সালে লাহোর দখল এবং 1801 সালে মহারাজা উপাধি গ্রহণ তাঁর ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন করে।
| ক্ষেত্র | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| রাজধানী | লাহোর |
| সেনাবাহিনী | পদাতিক, অশ্বারোহী, কামান ও ইউরোপীয় প্রশিক্ষক |
| প্রশাসন | শিখ, হিন্দু ও মুসলমান কর্মকর্তার অংশগ্রহণ |
| বিস্তার | পাঞ্জাব, মুলতান, কাশ্মীর ও পেশোয়ার পর্যন্ত |
| ইংরেজ সম্পর্ক | 1809 সালের অমৃতসর সন্ধিতে শতদ্রু সীমা |
রণজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর পরে দরবারি দ্বন্দ্ব ও সেনাবাহিনীর রাজনীতি পাঞ্জাবকে দুর্বল করে। প্রথম ইঙ্গ–শিখ যুদ্ধ (1845–1846) এবং দ্বিতীয় ইঙ্গ–শিখ যুদ্ধের (1848–1849) পরে 1849 সালে পাঞ্জাব কোম্পানির সাম্রাজ্যে যুক্ত হয়।
ল্যাপস নীতি
গভর্নর-জেনারেল ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি বা ল্যাপস নীতি প্রয়োগ করেন। কোনো কোম্পানি-অধীন রাজ্যের শাসক স্বাভাবিক পুরুষ উত্তরাধিকারী ছাড়া মারা গেলে দত্তক পুত্রের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অস্বীকার করে রাজ্য সংযুক্ত করা হত।
| সংযুক্ত রাজ্য | সাল |
|---|---|
| সাতারা | 1848 |
| সম্বলপুর | 1849 |
| ঝাঁসি | 1854 |
| নাগপুর | 1854 |
আওধ 1856 সালে ল্যাপস নীতিতে নয়; ‘কুশাসন’-এর অভিযোগে সংযুক্ত হয়।
আওধ সংযুক্তি
আওধ দীর্ঘদিন কোম্পানির মিত্র ও সেনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগক্ষেত্র ছিল। অধীনতামূলক মিত্রতার ব্যয় ও কোম্পানির হস্তক্ষেপ নবাবের ক্ষমতা কমায়। 1856 সালে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে অপসারণ করে কোম্পানি আওধ সংযুক্ত করে।
| কোম্পানির দাবি | বাস্তব রাজনৈতিক ফল |
|---|---|
| কুশাসন দূর করা | মিত্র রাজবংশের অবসান |
| উন্নত প্রশাসন | কোম্পানির প্রত্যক্ষ রাজস্ব ও ভূখণ্ড বৃদ্ধি |
| প্রজার সুরক্ষা | তালুকদার, দরবারি, সৈনিক ও কর্মচারীর স্থানচ্যুতি |
পরম কর্তৃত্বের দাবি
ঊনবিংশ শতাব্দীতে কোম্পানি নিজেকে ভারতীয় রাজ্যগুলির ওপর পরম কর্তৃত্বসম্পন্ন শক্তি হিসেবে দেখাতে শুরু করে। এই দাবিকে সর্বময়তা বলা হয়। সন্ধি, রেসিডেন্ট, সামরিক বাহিনী, উত্তরাধিকার অনুমোদন এবং সংযুক্তির মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যের সার্বভৌমত্ব সীমিত করা হয়।
মানচিত্র নির্মাণ ও জরিপ
ভূখণ্ড শাসনে মানচিত্র, ভূমিজরিপ, জনগণনা, উদ্ভিদ–প্রাণী সংগ্রহ এবং ভাষা–আইনের তথ্য কোম্পানির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জরিপ রাজস্ব নির্ধারণ, সড়ক, সেনাচলাচল, সীমানা ও সম্পদ শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়।
| জরিপের ধরন | প্রশাসনিক ব্যবহার |
|---|---|
| ভূমিজরিপ | জমির পরিমাণ, শ্রেণি ও রাজস্ব |
| ত্রিকোণমিতিক জরিপ | দূরত্ব, উচ্চতা ও নির্ভুল মানচিত্র |
| ভূতাত্ত্বিক জরিপ | কয়লা, ধাতু ও খনিজ |
| উদ্ভিদ জরিপ | বাণিজ্যিক উদ্ভিদ ও ঔষধি সম্পদ |
| নৃতাত্ত্বিক বিবরণ | জনগোষ্ঠীকে প্রশাসনিক শ্রেণিতে ভাগ করা |
কোম্পানি ও ভারতীয় সহযোগী
কোম্পানির শাসন শুধু অল্পসংখ্যক ইউরোপীয়ের দ্বারা পরিচালিত হয়নি। ভারতীয় ব্যাংকার, বণিক, দোভাষী, গোমস্তা, জমিদার, রাজস্বকর্মী, সৈনিক ও কেরানি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
| ভারতীয় সহযোগী | ভূমিকা |
|---|---|
| ব্যাংকার | ঋণ, অর্থ স্থানান্তর ও সেনাবাহিনীর অর্থসংস্থান |
| বণিক | পণ্য সরবরাহ ও রপ্তানি |
| গোমস্তা | তাঁতি ও উৎপাদকের সঙ্গে কোম্পানির যোগাযোগ |
| সিপাহি | কোম্পানির সামরিক শক্তির প্রধান অংশ |
| দোভাষী ও কেরানি | ভাষা, নথি ও প্রশাসন |
| জমিদার ও তালুকদার | রাজস্ব সংগ্রহ ও স্থানীয় কর্তৃত্ব |
কোম্পানি শাসনের আর্থিক–সামরিক চক্র
জয় করা অঞ্চলের রাজস্ব → স্থায়ী সেনাবাহিনী → নতুন যুদ্ধ → আরও ভূখণ্ড → অধিক রাজস্ব
ভারতীয় ব্যাংকারের ঋণ → যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ব্যয় → বিজয়ের পরে ক্ষতিপূরণ ও রাজস্ব → ঋণ পরিশোধ ও পরবর্তী অভিযান
এই চক্রে বাণিজ্যিক লাভ, রাজস্ব, ঋণ ও সামরিক শক্তি পরস্পরকে বাড়িয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভিত্তিক পার্থক্য
| বিষয় | সঠিক তথ্য |
|---|---|
| বাণিজ্যকুঠি | কোম্পানির গুদাম ও দপ্তর; আধুনিক উৎপাদনকারী কারখানা নয় |
| পলাশি ও বক্সার | পলাশি দরবারি প্রভাব বাড়ায়; বক্সার সামরিক ও রাজনৈতিক প্রাধান্য সুদৃঢ় করে |
| দেওয়ানি ও নিজামত | দেওয়ানি রাজস্ব ও দেওয়ানি বিচার; নিজামত পুলিশ ও ফৌজদারি শাসন |
| দ্বৈত শাসন | কোম্পানির সম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং নবাবের নামমাত্র প্রশাসনিক দায় |
| অধীনতামূলক মিত্রতা | রাজ্য সম্পূর্ণ সংযুক্ত না হলেও স্বাধীন সামরিক–কূটনৈতিক ক্ষমতা কমে যায় |
| ল্যাপস নীতি | দত্তক উত্তরাধিকার অস্বীকারের ভিত্তিতে সংযুক্তি |
| আওধ সংযুক্তি | ল্যাপস নীতিতে নয়; কুশাসনের অভিযোগে |
| রেসিডেন্ট | মিত্র দরবারে কোম্পানির রাজনৈতিক প্রতিনিধি |
| কোম্পানির সেনা | অধিকাংশ সৈনিক ভারতীয় সিপাহি; উচ্চ নেতৃত্ব ইউরোপীয় |
| কোম্পানি | 1833 সালের পরে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে মূলত প্রশাসনিক শাসকে রূপান্তরিত |
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
17. কোম্পানি শাসনের প্রতিষ্ঠা — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic