কৃষি
কৃষির ধরন, প্রধান ফসল, কৃষিঋতু, সেচ, কৃষি উন্নয়ন, সবুজ বিপ্লব ও টেকসই কৃষির বাংলা আলোচনা।
Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team
কৃষি (Agriculture)
মাটি চাষ করে ফসল উৎপাদন এবং গবাদিপশু পালনসহ সংশ্লিষ্ট কাজকে কৃষি বলা হয়। খাদ্য, পশুখাদ্য, তন্তু ও শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ কৃষি থেকে আসে। কৃষি একটি প্রাথমিক অর্থনৈতিক কাজ, কারণ এতে মানুষ প্রকৃতি থেকে সরাসরি উৎপাদন সংগ্রহ করে।
কৃষিব্যবস্থা
কৃষিব্যবস্থা হল জমি, শ্রম, বীজ, জল, সার, যন্ত্র, পুঁজি ও জ্ঞানের সমন্বয়ে পরিচালিত উৎপাদনব্যবস্থা।
উপকরণ → কৃষিকাজ → উৎপাদন
- উপকরণ: বীজ, সার, জল, শ্রম, যন্ত্র ও পুঁজি
- কৃষিকাজ: জমি প্রস্তুত, বপন, সেচ, আগাছা ও কীট নিয়ন্ত্রণ, ফসল কাটা
- উৎপাদন: খাদ্যশস্য, তন্তু, ফল, শাকসবজি, পশুজাত দ্রব্য ও অন্যান্য কাঁচামাল
কৃষিকে প্রভাবিতকারী প্রাকৃতিক উপাদান
| উপাদান | প্রভাব |
|---|---|
| ভূপ্রকৃতি | সমতল জমিতে যন্ত্র ও সেচ ব্যবহার সহজ; পাহাড়ে ধাপচাষ করা হয় |
| জলবায়ু (Climate) | তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত (Precipitation), আর্দ্রতা ও বৃদ্ধিকাল ফসল নির্ধারণ করে |
| মাটি | উর্বরতা, গঠন, জলধারণক্ষমতা ও অম্লতা ফসলের বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে |
| জল | বৃষ্টি কম বা অনিয়মিত হলে সেচের প্রয়োজন বাড়ে |
কৃষিকে প্রভাবিতকারী মানবীয় উপাদান
জমির আকার ও মালিকানা, শ্রম, পুঁজি, প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, সেচ, বাজার, পরিবহণ (Transport), সংরক্ষণব্যবস্থা এবং সরকারি নীতি কৃষির ধরন ও উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। একই প্রাকৃতিক পরিবেশেও এসব উপাদানের পার্থক্যে কৃষির ফলন আলাদা হতে পারে।
জীবিকানির্ভর কৃষি (Subsistence Farming)
কৃষক পরিবার প্রধানত নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ছোট জমিতে যে কৃষি করে, তাকে জীবিকানির্ভর কৃষি বলে। সাধারণত পারিবারিক শ্রম, স্থানীয় বীজ ও সহজ উপকরণ ব্যবহৃত হয়। উদ্বৃত্ত উৎপাদন কম থাকায় বাজারে বিক্রির পরিমাণও সীমিত।
নিবিড় জীবিকানির্ভর কৃষি
জনসংখ্যার চাপ বেশি এবং জমি কম এমন অঞ্চলে ছোট জমিতে অধিক শ্রম, সেচ ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে বেশি ফলন পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এক জমিতে বছরে একাধিক ফসলও উৎপাদিত হতে পারে। দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার বহু অঞ্চলে এই কৃষি দেখা যায়।
আদিম জীবিকানির্ভর কৃষি
ক্ষুদ্র জমি, সাধারণ যন্ত্র এবং পারিবারিক বা গোষ্ঠীগত শ্রমের ওপর নির্ভরশীল প্রাচীন ধরনের কৃষিকে আদিম জীবিকানির্ভর কৃষি বলা হয়। এর একটি রূপ স্থানান্তর কৃষি এবং অন্যটি যাযাবর পশুপালন।
স্থানান্তর কৃষি
বনভূমির একটি ছোট অংশ পরিষ্কার করে অল্প কয়েক বছর চাষ করার পর মাটির উর্বরতা কমলে অন্য স্থানে চলে যাওয়াকে স্থানান্তর কৃষি বলে। আগে দীর্ঘ বিরতিতে পুরোনো জমি স্বাভাবিকভাবে পুনরুদ্ধারের সময় পেত। জনসংখ্যার চাপ ও বিরতির সময় কমে গেলে বন ও মাটির ক্ষতি বাড়ে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এটি ঝুম চাষ নামে পরিচিত।
যাযাবর পশুপালন
পশুপালকেরা পশুর খাদ্য ও জলের সন্ধানে নির্দিষ্ট ঋতু বা পথ অনুসারে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করেন। উট, ভেড়া, ছাগল, ইয়াক বা রেনডিয়ার অঞ্চলভেদে পালন করা হয়। শুষ্ক, অর্ধশুষ্ক, তৃণভূমি ও শীতল অঞ্চলে এর প্রচলন বেশি।
বাণিজ্যিক কৃষি (Commercial Farming)
বাজারে বিক্রি ও লাভের উদ্দেশ্যে বৃহৎ পরিসরে ফসল বা পশুজাত দ্রব্য উৎপাদনকে বাণিজ্যিক কৃষি বলে। উন্নত বীজ, সেচ, রাসায়নিক বা জৈব উপকরণ, যন্ত্র, পুঁজি, পরিবহণ ও বাজারের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। উৎপাদনের বড় অংশ বাজারে যায়।
বাণিজ্যিক শস্যচাষ
বিস্তীর্ণ জমিতে যন্ত্রের সাহায্যে গম, ভুট্টা প্রভৃতি শস্য বাজারের জন্য উৎপাদিত হয়। কৃষিজমি বড় এবং জনঘনত্ব কম এমন নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি অঞ্চলে এই কৃষি বেশি দেখা যায়। উৎপাদন বেশি হলেও প্রতি একক জমিতে শ্রমের ব্যবহার সাধারণত কম।
মিশ্র কৃষি
একই কৃষিব্যবস্থায় ফসল উৎপাদন ও পশুপালন একসঙ্গে করা হলে তাকে মিশ্র কৃষি বলে। ফসলের অবশিষ্টাংশ পশুখাদ্য হিসেবে এবং পশুর গোবর জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এতে কৃষকের আয়ের উৎস বৈচিত্র্যময় হয় এবং ঝুঁকি কিছুটা কমে।
বাগিচা কৃষি
বৃহৎ খামার বা বাগানে একটিমাত্র প্রধান অর্থকরী ফসল বিশেষ ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন করাকে বাগিচা কৃষি বলে। চা, কফি, রবার, কোকো ও কলা এর উদাহরণ। এতে প্রচুর পুঁজি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, শ্রম, প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ও উন্নত পরিবহণ দরকার। উৎপাদিত ফসলের বড় অংশ বাজার বা রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হয়।
প্রধান খাদ্যশস্য
ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন মোটাদানার শস্য পৃথিবীর প্রধান খাদ্যশস্য। প্রতিটি ফসলের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মাটি ও বৃদ্ধিকালের চাহিদা আলাদা।
ধান
ধান উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর ফসল। উচ্চ তাপমাত্রা, প্রচুর জল এবং সমতল বা জলধারণক্ষম জমি ধানচাষে সহায়ক। বৃষ্টিপাত কম হলে সেচের প্রয়োজন হয়। গাঙ্গেয়-ব্রহ্মপুত্র সমভূমি, উপকূলীয় সমভূমি ও বদ্বীপ অঞ্চলে ধান গুরুত্বপূর্ণ ফসল। পাহাড়ি ঢালে ধাপ কেটে ধান চাষও করা হয়।
গম
গমের বৃদ্ধিকালে ঠান্ডা আবহাওয়া (Weather) এবং পাকার সময় উষ্ণ, শুষ্ক ও উজ্জ্বল আবহাওয়া উপযোগী। মাঝারি বৃষ্টি এবং সুনিষ্কাশিত দোআঁশ মাটি গমচাষে সহায়ক। ভারতে এটি প্রধানত শীতকালীন ফসল।
ভুট্টা ও মোটাদানার শস্য
ভুট্টার জন্য মাঝারি তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও সুনিষ্কাশিত উর্বর মাটি দরকার। খাদ্য, পশুখাদ্য ও শিল্পে এটি ব্যবহৃত হয়। জোয়ার, বাজরা ও রাগির মতো মোটাদানার শস্য তুলনামূলক কম বৃষ্টিতে জন্মাতে পারে এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। শুষ্ক অঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তায় এগুলির গুরুত্ব বেশি।
ডাল
ছোলা, মসুর, মুগ, অড়হর প্রভৃতি ডাল প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ডালজাতীয় উদ্ভিদের মূলের গুটিকায় থাকা জীবাণু বায়ুর নাইট্রোজেনকে মাটিতে ব্যবহারযোগ্য যৌগে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। তাই ফসল পর্যায়ক্রমে ডাল চাষ মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সহায়ক।
প্রধান অর্থকরী ও পানীয় ফসল
| ফসল | উপযোগী পরিবেশ ও বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| তুলা | উচ্চ তাপমাত্রা, হালকা বৃষ্টি, উজ্জ্বল রোদ ও দীর্ঘ তুষারমুক্ত সময়; কালো মাটি উপযোগী |
| পাট | উচ্চ তাপমাত্রা, প্রচুর বৃষ্টি ও আর্দ্রতা; পলিমাটি উপযোগী |
| আখ | উষ্ণ জলবায়ু, দীর্ঘ বৃদ্ধিকাল ও পর্যাপ্ত জল দরকার |
| চা | উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, সুনিষ্কাশিত ঢাল এবং নিয়মিত বৃষ্টি উপযোগী |
| কফি | উষ্ণ জলবায়ু, পরিমিত বৃষ্টি, ছায়া ও সুনিষ্কাশিত ঢাল উপযোগী |
| রবার | সারা বছর উচ্চ তাপমাত্রা ও প্রচুর বৃষ্টি দরকার |
কৃষিঋতু
| ঋতু | সাধারণ সময় | প্রধান উদাহরণ |
|---|---|---|
| খরিফ | বর্ষার শুরুতে বপন, বর্ষার শেষে বা শরতে কাটা | ধান, ভুট্টা, তুলা, পাট |
| রবি | শীতের শুরুতে বপন, বসন্তে কাটা | গম, ছোলা, সরিষা |
| জায়েদ | রবি ও খরিফের মধ্যবর্তী গ্রীষ্মকাল | তরমুজ, শসা ও কিছু সবজি |
ফসলের সঠিক বপন ও কাটার সময় অঞ্চল, বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও সেচের সুবিধা অনুসারে বদলাতে পারে।
কৃষি উন্নয়ন
একই জমিতে উৎপাদন বাড়ানো, চাষের ক্ষতি কমানো এবং কৃষকের জীবনমান উন্নত করার প্রচেষ্টাকে কৃষি উন্নয়ন বলা হয়। উন্নত বীজ, সেচ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, উপযুক্ত যন্ত্র, কৃষিশিক্ষা, ঋণ, সংরক্ষণ, পরিবহণ ও ন্যায্য বাজারব্যবস্থা এতে সহায়তা করে। শুধু উপকরণ বাড়ালেই উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না; পরিবেশ ও ক্ষুদ্র কৃষকের স্বার্থও রক্ষা করতে হয়।
কৃষিতে প্রযুক্তির ভূমিকা
যন্ত্র জমি প্রস্তুত ও ফসল কাটার সময় কমায়। সেচ বৃষ্টির অনিশ্চয়তা কমাতে পারে। আবহাওয়ার তথ্য, মাটির পরীক্ষা এবং রোগ শনাক্তকরণ সঠিক সিদ্ধান্তে সাহায্য করে। তবে প্রযুক্তি স্থানীয় পরিবেশ, জমির আকার, ব্যয় ও কৃষকের দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া দরকার।
সেচ
ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী কৃত্রিমভাবে জমিতে জল সরবরাহকে সেচ বলা হয়। কূপ, নলকূপ, পুকুর, খাল ও জলাধার সেচের উৎস। ফোঁটা সেচে গাছের গোড়ায় অল্প অল্প করে জল দেওয়া হয় এবং ছিটানো সেচে বৃষ্টির মতো জল ছড়ানো হয়। অতিরিক্ত সেচে জলাবদ্ধতা ও মাটির লবণাক্ততা বাড়তে পারে।
সবুজ বিপ্লব
উচ্চফলনশীল বীজ, নিশ্চিত সেচ, সার, কীট নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত কৃষিপদ্ধতির সমন্বয়ে খাদ্যশস্যের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধিকে সবুজ বিপ্লব বলা হয়। ভারতে এর প্রভাব প্রথমে গম এবং সেচসমৃদ্ধ কয়েকটি অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও অঞ্চল ও কৃষকভেদে সুবিধার অসমতা, ভূগর্ভস্থ জলের চাপ এবং মাটির অবক্ষয়ের মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
কৃষির পরিবেশগত সমস্যা
- অতিরিক্ত সেচে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা
- একই ফসল বারবার চাষে মাটির পুষ্টির ভারসাম্যহানি
- রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে মাটি ও জলদূষণ
- অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনে জলস্তর হ্রাস
- বনভূমি পরিষ্কার করে চাষ বাড়ালে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি
- ফসল কাটার পর অবশিষ্টাংশ পোড়ালে বায়ুদূষণ
টেকসই কৃষি
মাটির উর্বরতা, জল, জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) এবং কৃষকের জীবিকা রক্ষা করে দীর্ঘকাল উৎপাদন বজায় রাখাই টেকসই কৃষির লক্ষ্য। ফসল পর্যায়ক্রম, মিশ্রচাষ, জৈব পদার্থের ব্যবহার, সমন্বিত কীট ব্যবস্থাপনা, দক্ষ সেচ, কৃষিবনায়ন এবং স্থানীয়ভাবে উপযোগী বীজ এতে সহায়ক।
কৃষি ও বাজারের সম্পর্ক
কৃষকের আয় কেবল উৎপাদনের পরিমাণে নয়, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহণ, বাজারে প্রবেশ এবং প্রাপ্ত মূল্যের ওপরও নির্ভর করে। শীতল ভাণ্ডার ও দ্রুত পরিবহণ ফল, সবজি, দুধ ও মাছের অপচয় কমায়। বাজারের চাহিদা ফসল নির্বাচনকে প্রভাবিত করলেও খাদ্যনিরাপত্তা ও মাটির উপযোগিতাও বিবেচ্য।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভিত্তিক পার্থক্য
| বিষয় | সঠিক ধারণা |
|---|---|
| জীবিকানির্ভর কৃষি | প্রধান লক্ষ্য পরিবারের প্রয়োজন পূরণ |
| বাণিজ্যিক কৃষি | প্রধান লক্ষ্য বাজারে বিক্রি |
| মিশ্র কৃষি | ফসল উৎপাদন ও পশুপালন একসঙ্গে |
| বাগিচা কৃষি | বৃহৎ বাগানে সাধারণত একটি প্রধান অর্থকরী ফসল |
| স্থানান্তর কৃষি | কয়েক বছর চাষের পর অন্য জমিতে স্থানান্তর |
| খরিফ ফসল | সাধারণত বর্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত |
| রবি ফসল | সাধারণত শীতকালীন চাষের সঙ্গে সম্পর্কিত |
| কৃষি উন্নয়ন | শুধু জমি বাড়ানো নয়; উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের কল্যাণ বৃদ্ধি |
| টেকসই কৃষি | ভবিষ্যতের উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট না করে বর্তমান উৎপাদন |
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
33. কৃষি — MCQ Test
31 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic