জল
জলমণ্ডল, জলচক্র, মহাসাগর, তরঙ্গ, জোয়ার–ভাটা, স্রোত, নদী, হ্রদ, ভূগর্ভস্থ জল, জলসংকট ও সংরক্ষণের বাংলা আলোচনা।
Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team
জল
পৃথিবীর সমস্ত জল—মহাসাগর, সমুদ্র, নদী, হ্রদ, হিমবাহ, ভূগর্ভস্থ জল, মাটির আর্দ্রতা এবং বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প—মিলে জলমণ্ডল (Hydrosphere) গঠিত। পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় 71 শতাংশ জলাবৃত হলেও মানুষের সহজে ব্যবহারযোগ্য মিষ্টি জলের অংশ খুবই কম। জল বাষ্পীভবন (Evaporation), ঘনীভবন (Condensation), বৃষ্টিপাত (Precipitation), প্রবাহ ও অনুপ্রবেশের মাধ্যমে নিরন্তর এক ভাণ্ডার থেকে অন্য ভাণ্ডারে চলাচল করে।
পৃথিবীতে জলের বণ্টন
| জলের ভাণ্ডার | মোট জলের আনুমানিক অংশ | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| মহাসাগর ও সমুদ্র | প্রায় 97 শতাংশ | লবণাক্ত জল |
| হিমবাহ ও বরফস্তর | মিষ্টি জলের বৃহত্তম ভাণ্ডার | প্রধানত অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ড |
| ভূগর্ভস্থ জল | মিষ্টি জলের বড় তরল ভাণ্ডার | শিলা ও মাটির ফাঁকে সঞ্চিত |
| হ্রদ, নদী ও জলাভূমি | খুব সামান্য | মানুষের সহজে ব্যবহারযোগ্য অংশ |
| বায়ুমণ্ডল (Atmosphere) ও জীবদেহ | অতি সামান্য | জলচক্রে গুরুত্বপূর্ণ |
শতকরা (Percentage) মান উৎস ও শ্রেণিবিভাগভেদে সামান্য বদলাতে পারে। মূল কথা হল—জল প্রচুর হলেও ব্যবহারযোগ্য মিষ্টি জল সীমিত।
লবণাক্ত ও মিষ্টি জল
সমুদ্রের জলে দ্রবীভূত লবণের পরিমাণ বেশি বলে তা সাধারণ পানীয় বা অধিকাংশ ফসলের সেচে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়। নদী, অধিকাংশ হ্রদ, হিমবাহ ও ভূগর্ভস্থ জলের বড় অংশ মিষ্টি জল। ‘মিষ্টি’ বলতে চিনি মেশানো নয়, লবণের ঘনত্ব খুব কম বোঝায়।
জলচক্র (Water Cycle)
সূর্যের শক্তি ও পৃথিবীর মহাকর্ষের সাহায্যে জল পৃথিবী ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে নিরন্তর আবর্তিত হয়।
বাষ্পীভবন ও বাষ্পমোচন → ঘনীভবন → মেঘ → বৃষ্টিপাত বা তুষারপাত → পৃষ্ঠপ্রবাহ ও অনুপ্রবেশ → নদী, ভূগর্ভস্থ জল ও মহাসাগর → পুনরায় বাষ্পীভবন
জলচক্রের প্রধান প্রক্রিয়া
| প্রক্রিয়া | অর্থ |
|---|---|
| বাষ্পীভবন | তরল জল তাপ গ্রহণ করে জলীয় বাষ্পে পরিণত হয় |
| বাষ্পমোচন | উদ্ভিদের পাতার মাধ্যমে জলীয় বাষ্প নির্গমন |
| ঘনীভবন | জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে জলকণা বা বরফকণা হয় |
| অধঃক্ষেপণ | বৃষ্টি, তুষার, শিলা বা অন্য রূপে জল ভূপৃষ্ঠে পড়ে |
| অনুপ্রবেশ | জল মাটির ভেতরে প্রবেশ করে |
| ভূগর্ভে সঞ্চরণ | অনুপ্রবেশিত জল নিচে ও পাশে চলাচল করে |
| পৃষ্ঠপ্রবাহ | ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে জল নদী–হ্রদ–সমুদ্রে যায় |
জলচক্রের গুরুত্ব
জলচক্র মিষ্টি জল পুনর্নবীকরণ, আবহাওয়া (Weather), নদীর প্রবাহ, মাটির আর্দ্রতা এবং ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণে সাহায্য করে। মোট জলের পরিমাণ মোটামুটি স্থির থাকলেও কোনো অঞ্চলে জলের অবস্থান, গুণমান ও সহজলভ্যতা বদলাতে পারে। জলচক্র থাকা মানেই সর্বত্র পর্যাপ্ত পরিষ্কার জল পাওয়া যায় না।
মহাসাগর ও সমুদ্র
মহাসাগর পৃথিবীর বৃহৎ ও পরস্পরসংযুক্ত লবণাক্ত জলভাগ। সমুদ্র সাধারণত মহাসাগরের তুলনায় ছোট এবং আংশিকভাবে স্থলবেষ্টিত। সব মহাসাগর বাস্তবে একটি বিশ্বমহাসাগরের অংশ, কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী পাঁচটি নামে চিহ্নিত করা হয়।
পাঁচটি মহাসাগর
| মহাসাগর | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| প্রশান্ত মহাসাগর | বৃহত্তম ও গভীরতম; মারিয়ানা খাত অবস্থিত |
| আটলান্টিক মহাসাগর | দ্বিতীয় বৃহত্তম; ইউরোপ–আফ্রিকা ও আমেরিকার মধ্যে |
| ভারত মহাসাগর | তৃতীয় বৃহত্তম; উত্তরে এশিয়া দ্বারা বেষ্টিত |
| দক্ষিণ মহাসাগর | অ্যান্টার্কটিকাকে ঘিরে; শক্তিশালী বৃত্তাকার স্রোত |
| উত্তর মহাসাগর | ক্ষুদ্রতম ও অগভীরতম; বড় অংশ বরফাবৃত |
মহাসাগরীয় তলের ভূমিরূপ
| ভূমিরূপ | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| মহীসোপান | মহাদেশের নিমজ্জিত অগভীর প্রান্ত; মাছ ও খনিজে গুরুত্বপূর্ণ |
| মহীঢাল | মহীসোপানের পর খাড়া গভীরতামুখী ঢাল |
| গভীর সমুদ্র সমভূমি | বিস্তৃত ও তুলনামূলক সমতল গভীর তল |
| মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা | সমুদ্রতলে দীর্ঘ পর্বতমালা; নতুন ভূত্বক গঠনের অঞ্চল |
| সামুদ্রিক খাত | সরু, দীর্ঘ ও অত্যন্ত গভীর অবনমন |
| সামুদ্রিক পাহাড় | জলতলের আগ্নেয় বা অন্যান্য উচ্চভূমি |
লবণতা
এক কিলোগ্রাম সমুদ্রজলে দ্রবীভূত লবণের মোট পরিমাণকে লবণতা বলা হয়। খোলা মহাসাগরের গড় লবণতা প্রায় 35 প্রতি সহস্রাংশ। বাষ্পীভবন বেশি হলে লবণতা বাড়ে; বৃষ্টি, নদীর জল বা বরফগলন বেশি হলে কমে।
| লবণতা বাড়ায় | লবণতা কমায় |
|---|---|
| প্রবল বাষ্পীভবন | বেশি বৃষ্টিপাত |
| কম বৃষ্টিপাত | নদীর মিষ্টি জল |
| সমুদ্রবরফ গঠন | বরফ ও হিমবাহ গলন |
| সীমিত জলবিনিময় | খোলা মহাসাগরের সঙ্গে বেশি মিশ্রণ |
সমুদ্রজলের তাপমাত্রা
অক্ষাংশ (Latitude), ঋতু, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত এবং গভীরতার ওপর সমুদ্রজলের তাপমাত্রা নির্ভর করে। পৃষ্ঠজল সাধারণত বিষুব অঞ্চলে উষ্ণ ও মেরুতে শীতল। গভীরতার সঙ্গে তাপমাত্রা কমে; একটি স্তরে দ্রুত হ্রাসকে তাপঢাল স্তর বলা হয়।
মহাসাগরীয় জলের প্রধান গতি
| গতি | প্রধান কারণ | প্রকৃতি |
|---|---|---|
| তরঙ্গ | প্রধানত বায়ু | পৃষ্ঠে শক্তির ওঠানামা |
| জোয়ার–ভাটা | চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষ | নিয়মিত জলস্তর বৃদ্ধি–হ্রাস |
| স্রোত | বায়ু, ঘনত্ব, আবর্তন ও উপকূল | নির্দিষ্ট দিকে জলের দীর্ঘ প্রবাহ |
সমুদ্রতরঙ্গ
বায়ু সমুদ্রপৃষ্ঠে ঘর্ষণ সৃষ্টি করলে অধিকাংশ তরঙ্গ তৈরি হয়। তরঙ্গে জলকণা সাধারণত বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার পথে দুলে প্রায় আগের স্থানে ফিরে আসে; শক্তি সামনে অগ্রসর হয়। উপকূলের অগভীর জলে তরঙ্গের নিচের অংশ বাধা পেয়ে ঢেউ ভেঙে পড়ে।
| অংশ | অর্থ |
|---|---|
| শীর্ষ | তরঙ্গের সর্বোচ্চ অংশ |
| পাদ | সর্বনিম্ন অংশ |
| তরঙ্গদৈর্ঘ্য | পরপর দুটি শীর্ষ বা পাদের দূরত্ব |
| তরঙ্গউচ্চতা | শীর্ষ ও পাদের উল্লম্ব পার্থক্য |
সুনামি
সমুদ্রতলের ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, ভূমিধস বা বিরলভাবে মহাজাগতিক বস্তুপতনে বিপুল জলরাশি স্থানচ্যুত হলে দীর্ঘ তরঙ্গের সুনামি তৈরি হতে পারে। গভীর সমুদ্রে এটি দ্রুত চললেও উচ্চতা কম থাকে; অগভীর উপকূলে গতি কমে ও উচ্চতা বাড়ে। সুনামি সাধারণ জোয়ার নয় এবং আবহাওয়ার কারণে তৈরি হয় না।
জোয়ার ও ভাটা
চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষ এবং পৃথিবী–চাঁদ ব্যবস্থার গতির কারণে সমুদ্রজলের নিয়মিত ওঠাকে জোয়ার এবং নামাকে ভাটা বলা হয়। চাঁদ পৃথিবীর কাছাকাছি বলে সূর্যের তুলনায় জোয়ার সৃষ্টিতে বেশি প্রভাবশালী। অধিকাংশ উপকূলে প্রতিদিন প্রায় দুটি জোয়ার ও দুটি ভাটা দেখা যায়, তবে স্থানীয় উপকূলরূপে ধরন বদলায়।
ভরা কটাল ও মরা কটাল
| অবস্থা | জ্যোতিষ্কের অবস্থান | ফল |
|---|---|---|
| ভরা কটাল | অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় সূর্য–পৃথিবী–চাঁদ প্রায় এক সরলরেখায় | জোয়ার ও ভাটার পার্থক্য সর্বাধিক |
| মরা কটাল | প্রথম ও শেষ চতুর্থীতে সূর্য ও চাঁদের টান প্রায় সমকোণে | জোয়ার ও ভাটার পার্থক্য সর্বনিম্ন |
ভরা কটাল শুধু পূর্ণিমায় নয়; অমাবস্যাতেও ঘটে। মরা কটাল মানে জোয়ার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
জোয়ারের গুরুত্ব
- নদীমোহনা ও কিছু বন্দরে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে।
- জোয়ারভাটার শক্তি থেকে বিদ্যুৎ (Electricity) উৎপাদন করা যায়।
- মোহনা ও জলাভূমিতে পুষ্টি ও জীবের চলাচল ঘটায়।
- মাছধরা ও উপকূলীয় জীবিকায় সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রবল জোয়ার ঝড়ের জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে মিললে উপকূলীয় বন্যা বাড়াতে পারে।
মহাসাগরীয় স্রোত
মহাসাগরের জল নির্দিষ্ট দিক ও পথে দীর্ঘ দূরত্বে প্রবাহিত হলে তাকে সমুদ্রস্রোত বলা হয়। পৃষ্ঠস্রোত প্রধানত স্থায়ী বায়ু ও পৃথিবীর আবর্তনে এবং গভীর স্রোত তাপমাত্রা–লবণতাজনিত ঘনত্বের পার্থক্যে চালিত হয়। মহাদেশের অবস্থান স্রোতের পথ ঘুরিয়ে দেয়।
উষ্ণ ও শীতল স্রোত
| ধরন | সাধারণ প্রবাহ | প্রভাব |
|---|---|---|
| উষ্ণ স্রোত | নিম্ন অক্ষাংশ থেকে উচ্চ অক্ষাংশে | সংলগ্ন উপকূল উষ্ণ ও আর্দ্র করতে পারে |
| শীতল স্রোত | উচ্চ অক্ষাংশ থেকে নিম্ন অক্ষাংশে | উপকূল শীতল ও শুষ্ক করতে পারে; কুয়াশা সৃষ্টি হতে পারে |
স্রোতের ‘উষ্ণ’ বা ‘শীতল’ পরিচয় আশপাশের জলের তুলনায়। সব উষ্ণ স্রোতের তাপমাত্রা সর্বত্র একই নয়।
প্রধান সমুদ্রস্রোত
| স্রোত | মহাসাগর | প্রকৃতি |
|---|---|---|
| উপসাগরীয় স্রোত | উত্তর আটলান্টিক | উষ্ণ |
| উত্তর আটলান্টিক প্রবাহ | উত্তর আটলান্টিক | উষ্ণ |
| ল্যাব্রাডর স্রোত | উত্তর আটলান্টিক | শীতল |
| ক্যানারি স্রোত | উত্তর আটলান্টিক | শীতল |
| কুরোশিও | উত্তর প্রশান্ত | উষ্ণ |
| ওয়াশিও | উত্তর প্রশান্ত | শীতল |
| পেরু বা হামবোল্ট স্রোত | দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত | শীতল |
| বেঙ্গুয়েলা স্রোত | দক্ষিণ-পূর্ব আটলান্টিক | শীতল |
| পশ্চিম অস্ট্রেলীয় স্রোত | ভারত মহাসাগর | শীতল |
সমুদ্রস্রোতের প্রভাব
সমুদ্রস্রোত তাপ পুনর্বণ্টন, উপকূলের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, কুয়াশা, সামুদ্রিক জীব ও নৌপথে প্রভাব ফেলে। উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে পুষ্টিসমৃদ্ধ জল ও প্ল্যাঙ্কটনের কারণে উন্নত মৎস্যক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। উষ্ণ জল সব সময় বেশি মাছ দেয়—এমন নয়; পুষ্টির সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ।
ঊর্ধ্বমুখী জলসঞ্চালন
বায়ু ও পৃথিবীর আবর্তনে উপকূল থেকে পৃষ্ঠজল সরে গেলে গভীরের শীতল, পুষ্টিসমৃদ্ধ জল ওপরে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়াকে ঊর্ধ্বমুখী জলসঞ্চালন বলা হয়। পেরু, নামিবিয়া ও অন্যান্য পশ্চিম উপকূলে এর ফলে সমৃদ্ধ মৎস্যক্ষেত্র দেখা যায়।
স্থলভাগের মিষ্টি জল
বৃষ্টির জল নদী, হ্রদ, জলাভূমি, মাটি ও ভূগর্ভে সঞ্চিত হয়। এই ভাণ্ডার পানীয়, কৃষি (Agriculture), শিল্প, জলবিদ্যুৎ ও জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি। মিষ্টি জল পুনর্নবীকরণযোগ্য হলেও দূষণ, অতিরিক্ত উত্তোলন ও অসম বণ্টনে সংকট তৈরি হয়।
নদী অববাহিকা
একটি প্রধান নদী ও তার উপনদীগুলি যে অঞ্চল থেকে জল সংগ্রহ করে তাকে নদী অববাহিকা বলা হয়। দুটি অববাহিকার সীমা গঠনকারী উচ্চভূমি জলবিভাজিকা। নদী অববাহিকা প্রশাসনিক সীমানা মানে না; তাই জল ব্যবস্থাপনায় পুরো অববাহিকাকে একক হিসেবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| উৎস | নদীর শুরুস্থল |
| উপনদী | যে ছোট নদী প্রধান নদীতে মেশে |
| শাখানদী | প্রধান নদী থেকে বেরিয়ে অন্য পথে প্রবাহিত হয় |
| মোহনা | নদী যেখানে সমুদ্র, হ্রদ বা অন্য নদীতে মেশে |
| জলবিভাজিকা | দুটি অববাহিকাকে পৃথক করা উচ্চভূমি |
| বদ্বীপ | মোহনায় পলি জমে গঠিত নিম্নভূমি |
নদীর কাজ
| পর্যায় | প্রধান কাজ | সাধারণ ভূমিরূপ |
|---|---|---|
| উচ্চগতি | ক্ষয় | ভি-আকৃতির উপত্যকা, গিরিখাত ও জলপ্রপাত |
| মধ্যগতি | বহন ও পার্শ্বক্ষয় | নদীবাঁক ও প্রশস্ত উপত্যকা |
| নিম্নগতি | সঞ্চয় | বন্যাসমভূমি, প্রাকৃতিক বাঁধ ও বদ্বীপ |
সব নদী একইভাবে বিকশিত হয় না। শিলা, ঢাল, জলপ্রবাহ, পলি, সমুদ্রতরঙ্গ ও মানুষের হস্তক্ষেপ ভূমিরূপকে প্রভাবিত করে।
বদ্বীপ ও মোহনা
নদীর পলি সঞ্চয়ের হার সমুদ্রের অপসারণের চেয়ে বেশি হলে বদ্বীপ তৈরি হতে পারে। শক্তিশালী জোয়ার, স্রোত বা গভীর উপকূলে পলি সরিয়ে নিলে চওড়া ফানেলাকৃতি মোহনা গঠিত হতে পারে। সব নদীর মোহনায় বদ্বীপ হয় না।
হ্রদ ও জলাভূমি
হ্রদ প্রাকৃতিক বা মানবনির্মিত হতে পারে। জলাভূমি বছরের স্থায়ী বা ঋতুভিত্তিক সময়ে জলসিক্ত অঞ্চল। এগুলি জল সঞ্চয়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণ, পলি ও দূষক আটকানো, মাছ ও পাখির আবাস এবং জীবিকার উৎস। জলাভূমি ‘অব্যবহৃত জমি’ নয়।
হিমবাহ
বরফ দীর্ঘদিন জমে ও চাপে ধীরে চলমান বরফরাশিতে পরিণত হলে হিমবাহ তৈরি হয়। পার্বত্য ও মেরু হিমবাহ মিষ্টি জলের বৃহৎ ভাণ্ডার। গলিত জল বহু নদীকে পুষ্ট করে। দ্রুত হিমবাহ গলন প্রথমে প্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, পরে দীর্ঘমেয়াদে শুষ্ক মৌসুমের জল সরবরাহ কমাতে পারে।
ভূগর্ভস্থ জল
বৃষ্টির জল মাটি ও ভেদ্য শিলার ফাঁক দিয়ে নিচে প্রবেশ করে ভূগর্ভে সঞ্চিত হয়। যে শিলা বা পলিস্তর পর্যাপ্ত জল ধারণ ও পরিবহণ (Transport) করতে পারে তাকে জলধারক স্তর বলা হয়। ভূগর্ভস্থ জলের ওপরের সম্পৃক্ত সীমা হল জলস্তর।
| ধারণা | অর্থ |
|---|---|
| ভেদ্য স্তর | যার মধ্য দিয়ে জল সহজে চলতে পারে |
| অভেদ্য স্তর | যার মধ্য দিয়ে জল চলাচল খুব ধীর |
| জলধারক স্তর | জল সঞ্চয় ও সরবরাহ করতে সক্ষম স্তর |
| জলস্তর | ভূগর্ভে সম্পৃক্ত অঞ্চলের ওপরের সীমা |
| প্রস্রবণ | ভূগর্ভস্থ জল স্বাভাবিকভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসে |
ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ ও সংকট
বৃষ্টি, নদী, পুকুর ও সেচের কিছু জল মাটিতে ঢুকে জলধারক স্তর পুনর্ভরণ করে। শহরের কংক্রিট, জলাভূমি ভরাট ও বননাশ অনুপ্রবেশ কমাতে পারে। উত্তোলন পুনর্ভরণের চেয়ে বেশি হলে জলস্তর নেমে যায়, কূপ শুকায়, ভূমি বসে যেতে পারে এবং উপকূলে লবণাক্ত জল ঢুকতে পারে।
জলসংকটের কারণ
| কারণ | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| অসম বৃষ্টিপাত | অঞ্চল ও ঋতুভেদে জলের বড় পার্থক্য |
| জনসংখ্যা ও নগরায়ণ (Urbanisation) | গৃহস্থালি ও পরিষেবার চাহিদা বৃদ্ধি |
| সেচ | বহু অঞ্চলে মোট মিষ্টি জল ব্যবহারের বৃহত্তম অংশ |
| শিল্প | জল গ্রহণ ও দূষণের সম্ভাবনা |
| ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্ত উত্তোলন | জলস্তর নামা ও কূপ শুকানো |
| দূষণ | উপলভ্য জল ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়া |
| দুর্বল ব্যবস্থাপনা | ফুটো, অপচয় ও অসম বণ্টন |
| জলবায়ু (Climate) পরিবর্তন | বৃষ্টি, তুষার, খরা ও চরম ঘটনার ধরন বদল |
জলসংকট শুধু প্রাকৃতিক জলের অভাব নয়; পরিষ্কার জল পাওয়ার অধিকার, অবকাঠামো, মূল্য ও বণ্টনের সমস্যাও এর অংশ।
জলদূষণ
| উৎস | প্রধান দূষক বা প্রভাব |
|---|---|
| অপরিশোধিত নিকাশি | রোগজীবাণু ও জৈব দূষণ |
| শিল্পবর্জ্য | রাসায়নিক, ভারী ধাতু ও তাপ |
| কৃষি | সার, কীটনাশক ও পলিপ্রবাহ |
| খনি | অম্লীয় জল ও ধাতু |
| কঠিন বর্জ্য | প্লাস্টিক ও ক্ষতিকর পদার্থ |
| তেল ছড়ানো | সামুদ্রিক পাখি, মাছ ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি |
অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস জলাশয়ে শৈবালের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। পচনের সময় অক্সিজেন কমে মাছ ও অন্যান্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পানীয় জল ও স্বাস্থ্য
নিরাপদ পানীয় জল রোগজীবাণু, বিষাক্ত রাসায়নিক ও ক্ষতিকর মাত্রার লবণ থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। জল ফুটানো জীবাণুর বড় অংশ ধ্বংস করে, কিন্তু আর্সেনিক বা লবণ সরায় না। দূষকের ধরন অনুযায়ী ছাঁকন, জীবাণুনাশ, রাসায়নিক শোধন বা বিশেষ প্রযুক্তি প্রয়োজন।
জল সংরক্ষণ
| পদ্ধতি | উদ্দেশ্য |
|---|---|
| বৃষ্টির জল সংগ্রহ | ছাদ বা ভূমির প্রবাহ ধরে ব্যবহার ও পুনর্ভরণ |
| জলাধার ও পুকুর পুনরুদ্ধার | স্থানীয় সঞ্চয় ও ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণ |
| ক্ষুদ্র বাঁধ ও খাত | প্রবাহ ধীর করে মাটিতে অনুপ্রবেশ বাড়ানো |
| ফোঁটা সেচ | গাছের গোড়ায় অল্প অল্প জল দেওয়া |
| ছিটিয়ে সেচ | নিয়ন্ত্রিতভাবে বৃষ্টির মতো জল ছড়ানো |
| বর্জ্যজল শোধন | পুনর্ব্যবহার ও দূষণ কমানো |
| ফসল নির্বাচন | স্থানীয় জলপ্রাপ্যতার সঙ্গে উপযোগী ফসল |
| ফুটো নিয়ন্ত্রণ | শহর ও সেচব্যবস্থায় অপচয় কমানো |
বৃষ্টির জল সংগ্রহ
ছাদের জল নালা দিয়ে ট্যাংকে জমিয়ে ব্যবহার করা যায় অথবা পুনর্ভরণ কূপের মাধ্যমে মাটিতে প্রবেশ করানো যায়। ব্যবস্থায় ছাদের পরিচ্ছন্নতা, প্রথম বৃষ্টির দূষিত জল আলাদা করা, ছাঁকন এবং ট্যাংক ঢেকে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
জলাধার ব্যবস্থাপনা
একটি ক্ষুদ্র নদী বা নালার অববাহিকায় মাটি, জল, উদ্ভিদ ও জীবিকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনাকে জলাধার ব্যবস্থাপনা বলা হয়। ঢালে বৃক্ষ ও ঘাস, সমোচ্চরেখা বরাবর বাঁধ, ক্ষুদ্র জলরোধক এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ মাটিক্ষয় কমায় ও জল পুনর্ভরণ বাড়ায়।
বাঁধ: সুবিধা ও সামাজিক–পরিবেশগত প্রভাব
| সম্ভাব্য সুবিধা | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|
| সেচ ও পানীয় জল | গ্রাম, বন ও কৃষিজমি ডুবে স্থানচ্যুতি |
| জলবিদ্যুৎ | নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও মাছের চলাচল বাধা |
| বন্যা নিয়ন্ত্রণ | পলি আটকে বদ্বীপ ও নিম্নপ্রবাহে ক্ষয় |
| নৌচলাচল ও সংরক্ষণ | বাষ্পীভবন, জলজনিত রোগ ও ভূকম্পীয় চাপের সম্ভাবনা |
বাঁধের ফল স্থান, নকশা ও পরিচালনাভেদে বদলে যায়। লাভ–ক্ষতি, পুনর্বাসন ও নিম্নপ্রবাহের অধিকার একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
বন্যা
নদীর জল স্বাভাবিক তীর ছাড়িয়ে আশপাশের ভূমি প্লাবিত করলে বন্যা ঘটে। অতিবৃষ্টি, তুষারগলন, ঘূর্ণিঝড়, বাঁধভাঙা, নদীপথ সংকোচন ও দুর্বল নিষ্কাশন কারণ হতে পারে। বন্যা পলি ও উর্বরতা আনতে পারে, কিন্তু বসতি ও জীবনে বিপুল ক্ষতি করে। বন্যাসমভূমিতে পরিকল্পনাহীন নির্মাণ ঝুঁকি বাড়ায়।
খরা
দীর্ঘ সময় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিতে জলাভাব সৃষ্টি হলে আবহাওয়াগত খরা দেখা দেয়। মাটির আর্দ্রতা কমে কৃষি খরা এবং নদী–জলাধার–ভূগর্ভস্থ জল কমে জলবৈজ্ঞানিক খরা হতে পারে। একই বৃষ্টিহীনতা দুর্বল জলব্যবস্থাপনায় বেশি এবং সংরক্ষণে কম ক্ষতি করতে পারে।
উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস
ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বায়ু ও নিম্নচাপে সমুদ্রের জল অস্বাভাবিকভাবে উপকূলে উঠে এলে জলোচ্ছ্বাস ঘটে। উচ্চ জোয়ার, অগভীর ফানেলাকৃতি উপকূল এবং ম্যানগ্রোভ নষ্ট হলে ক্ষতি বাড়তে পারে। আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র ও সুরক্ষিত উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) প্রাণহানি কমায়।
মহাসাগরের পরিবেশগত গুরুত্ব
মহাসাগর পৃথিবীর তাপ শোষণ ও বণ্টন করে, জলচক্র চালায়, কার্বন ডাই-অক্সাইডের অংশ গ্রহণ করে এবং বিপুল জীববৈচিত্র্যের আবাস। সামুদ্রিক অণুউদ্ভিদ পৃথিবীর অক্সিজেন উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত উষ্ণতা, অম্লতা, দূষণ, প্লাস্টিক ও অতিরিক্ত মাছধরা মহাসাগরীয় বাস্তুতন্ত্রে চাপ সৃষ্টি করে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভিত্তিক পার্থক্য
| বিষয় | সঠিক তথ্য |
|---|---|
| জলমণ্ডল | শুধু মহাসাগর নয়; সব অবস্থার সমস্ত জল অন্তর্ভুক্ত |
| মিষ্টি জল | পৃথিবীতে অল্প; সহজলভ্য অংশ আরও কম |
| জলচক্র | মোট জল ঘোরায়; সর্বত্র নিরাপদ জল নিশ্চিত করে না |
| তরঙ্গ | প্রধানত শক্তি অগ্রসর করে; জলরাশি দীর্ঘ দূরত্বে একইভাবে যায় না |
| সুনামি | জোয়ার বা আবহাওয়াজনিত সাধারণ ঢেউ নয় |
| জোয়ার | চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষে নিয়মিত জলস্তর পরিবর্তন |
| ভরা কটাল | অমাবস্যা ও পূর্ণিমা—দুই সময়েই হয় |
| মরা কটাল | জোয়ার বন্ধ নয়; জোয়ার–ভাটার পার্থক্য কম |
| সমুদ্রস্রোত | নির্দিষ্ট পথে দীর্ঘ জলপ্রবাহ; তরঙ্গের থেকে আলাদা |
| নদী অববাহিকা | প্রশাসনিক সীমানা নয়; জলপ্রবাহের প্রাকৃতিক একক |
| মোহনা ও বদ্বীপ | সব নদী বদ্বীপ তৈরি করে না |
| ভূগর্ভস্থ জল | ভূগর্ভের বিশাল ফাঁকা হ্রদ নয়; শিলা ও পলির ফাঁকে সঞ্চিত |
| নবীকরণযোগ্য জল | অতিরিক্ত উত্তোলন ও দূষণে স্থানীয়ভাবে নিঃশেষ হতে পারে |
| জলসংকট | শুধু কম বৃষ্টি নয়; দূষণ, বণ্টন ও প্রবেশাধিকারের সমস্যাও |
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
30. জল — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic