জাতীয়তাবাদী আন্দোলন
কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা, স্বদেশি, গান্ধীয় আন্দোলন, বিপ্লবী ধারা, কৃষক–শ্রমিক অংশগ্রহণ, ভারত ছাড়ো, স্বাধীনতা ও দেশভাগের সারণি-সমৃদ্ধ বাংলা আলোচনা।
Author: Mr. Sandipan Roy, M.A., B.Ed. Last reviewed: 2026-09-25Report a correction
ভারতীয় জাতীয়তাবাদ (Nationalism) কোনো একদিনে বা একজন নেতার উদ্যোগে তৈরি হয়নি। ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণ, বর্ণবৈষম্য, আধুনিক শিক্ষা, মুদ্রণ, যোগাযোগব্যবস্থা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন এবং বিশ্বের অন্য জাতীয় আন্দোলনের প্রভাবে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক চেতনা গড়ে ওঠে। এর ভেতরে উদারপন্থী আবেদন, স্বদেশি, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, গান্ধীয় গণআন্দোলন, কৃষক–শ্রমিক সংগ্রাম, দলিত ও নারী আন্দোলন এবং বিভিন্ন ধর্মীয়–আঞ্চলিক রাজনীতির ধারা সহাবস্থান করেছে।
আন্দোলনের ধারাচিত্র
ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা → আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমিতি → ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস → স্বদেশি ও স্বরাজ → গণআন্দোলন → পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি → আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো → স্বাধীনতা ও দেশভাগ
জাতীয়তাবাদের পটভূমি
| উপাদান | প্রভাব |
|---|---|
| আধুনিক শিক্ষা | স্বাধীনতা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের ধারণা ছড়ায় |
| সংবাদপত্র | বিভিন্ন অঞ্চলের অভিযোগ ও আন্দোলনের সংবাদ পৌঁছায় |
| রেল ও ডাক | মানুষ, ধারণা ও সংগঠনের যোগাযোগ (Communication) বাড়ায় |
| ঔপনিবেশিক আইন | একই প্রশাসনিক কাঠামোর অভিজ্ঞতা তৈরি করে |
| অর্থনৈতিক শোষণ | সম্পদের বহির্গমন ও দারিদ্র্যের সমালোচনা জোরদার করে |
| বর্ণবৈষম্য | ভারতীয়দের মধ্যে যৌথ অপমান ও রাজনৈতিক ক্ষোভ সৃষ্টি করে |
| ইতিহাস ও সংস্কৃতি | অতীতের নতুন ব্যাখ্যা আত্মমর্যাদা জাগায় |
প্রাথমিক রাজনৈতিক সংগঠন
ঊনবিংশ শতকে কলকাতা, বোম্বাই, পুনে ও মাদ্রাজে শিক্ষিত ভারতীয়দের সংগঠন গড়ে ওঠে। তারা প্রশাসনিক সংস্কার, সরকারি চাকরিতে সুযোগ, আইন পরিষদে প্রতিনিধিত্ব এবং ব্যয় কমানোর দাবি জানায়।
| সংগঠন | সাল | সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা অঞ্চল |
|---|---|---|
| ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন | 1851 | বাংলা |
| পুনা সর্বজনিক সভা | 1870 | মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ |
| ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন | 1876 | সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু |
| মাদ্রাজ মহাজন সভা | 1884 | মাদ্রাজ |
| বোম্বে প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশন | 1885 | ফিরোজশাহ মেহতা, কে. টি. তেলাং, বদরুদ্দিন তায়াবজি |
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা
1885 সালের ডিসেম্বরে বোম্বাইয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ কর্মকর্তা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম উদ্যোগে সহায়তা করেন এবং উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম সভাপতি হন। 72 জন প্রতিনিধি অংশ নেন। কংগ্রেস দ্রুত সর্বভারতীয় আলোচনার মঞ্চে পরিণত হয়, যদিও প্রথমদিকে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রাধান্য ছিল।
প্রাথমিক জাতীয়তাবাদী বা নরমপন্থী পর্যায়
দাদাভাই নওরোজি, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরোজশাহ মেহতা, গোপালকৃষ্ণ গোখলে ও এম. জি. রানাডের মতো নেতা আবেদন, প্রস্তাব, বক্তৃতা ও ব্রিটিশ জনমতকে প্রভাবিত করার পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তাঁরা আইন পরিষদ সম্প্রসারণ, ভারতীয়করণ, সামরিক ব্যয় হ্রাস এবং অর্থনৈতিক সংস্কার দাবি করেন।
অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ
দাদাভাই নওরোজির সম্পদ বহির্গমন তত্ত্ব দেখায় যে বেতন, পেনশন, মুনাফা, ঋণের সুদ ও সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে চলে যাচ্ছে। আর. সি. দত্ত ভূমিরাজস্ব, দুর্ভিক্ষ ও ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সমালোচনা করেন। এই বিশ্লেষণ দারিদ্র্যকে ভারতীয় সমাজের স্বাভাবিক দুর্বলতা নয়, ঔপনিবেশিক নীতির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
ভারতীয় রাজস্ব → ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর ব্যয় → পেনশন, সুদ ও মুনাফা → ব্রিটেনে সম্পদ স্থানান্তর
বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলন
লর্ড কার্জন 1905 সালের 16 অক্টোবর বাংলা ভাগ কার্যকর করেন। সরকারি যুক্তি ছিল প্রশাসনিক সুবিধা; জাতীয়তাবাদীরা একে বাঙালি রাজনৈতিক শক্তি ও হিন্দু–মুসলমান ঐক্য দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন। বয়কট, স্বদেশি পণ্য, জাতীয় শিক্ষা, সভা, গান ও পিকেটিং আন্দোলনের প্রধান পদ্ধতি হয়। 1911 সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়।
| কর্মসূচি | রূপ |
|---|---|
| বয়কট | বিদেশি কাপড় ও পণ্য বর্জন |
| স্বদেশি | দেশীয় শিল্প ও পণ্য ব্যবহার |
| জাতীয় শিক্ষা | ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান |
| জনসংস্কৃতি | গান, রাখিবন্ধন, মেলা ও প্রতীক |
| নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ | সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার সহযোগিতা প্রত্যাহার |
লাল–বাল–পাল ও স্বরাজ
লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক ও বিপিনচন্দ্র পালকে লাল–বাল–পাল বলা হয়। তাঁরা স্বরাজ, স্বদেশি, বয়কট ও গণসংগঠনের ওপর জোর দেন। তিলক গণপতি উৎসব ও শিবাজী উৎসবকে জনরাজনীতির মঞ্চে পরিণত করেন। ‘স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার’ তাঁর সঙ্গে যুক্ত বিখ্যাত আহ্বান।
সুরাট বিভাজন
1907 সালের সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থী অংশ সাংগঠনিকভাবে বিভক্ত হয়। নেতৃত্ব, কর্মসূচি ও আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধ এর কারণ। এটি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বহুমতের পরিচয়, কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছর কংগ্রেসকে দুর্বলও করে।
মুসলিম লীগ ও পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী
1906 সালে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম অভিজাতের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থরক্ষা ছিল প্রাথমিক উদ্দেশ্য। 1909 সালের মর্লে–মিন্টো সংস্কার মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী চালু করে। এর ফলে ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তি করা হয়। মুসলিম রাজনীতি একরূপ ছিল না এবং বহু মুসলমান কংগ্রেস ও অন্য জাতীয়তাবাদী ধারায়ও সক্রিয় ছিলেন।
বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ
বাংলা, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব এবং বিদেশে কিছু যুবক গোপন সমিতি, অস্ত্র সংগ্রহ ও ব্রিটিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আক্রমণের পথ নেন। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, অভিনব ভারত এবং গদর পার্টি উল্লেখযোগ্য। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন, বিনায়ক দামোদর সাভারকর এবং লালা হরদয়াল বিভিন্ন ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হলেও ব্যাপক গণসংগঠনের সীমাবদ্ধতা ছিল।
হোম রুল আন্দোলন ও লক্ষ্ণৌ চুক্তি
1916 সালে বাল গঙ্গাধর তিলক ও অ্যানি বেসান্ত পৃথক হোম রুল লীগ গড়ে স্বশাসনের দাবি প্রচার করেন। একই বছরে কংগ্রেসের লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে নরমপন্থী ও চরমপন্থীরা পুনর্মিলিত হয় এবং কংগ্রেস–মুসলিম লীগ লক্ষ্ণৌ চুক্তিতে সাংবিধানিক সংস্কারের যৌথ দাবি তোলে।
গান্ধীর রাজনৈতিক পদ্ধতি
দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহের অভিজ্ঞতা নিয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী 1915 সালে ভারতে ফেরেন। সত্যাগ্রহে সত্য, অহিংসা, আত্মসংযম এবং অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অসহযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি স্থানীয় সমস্যাকে সর্বভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে কৃষক, শ্রমিক, নারী ও শহুরে মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ বাড়ান।
গান্ধীর প্রাথমিক সত্যাগ্রহ
| আন্দোলন | সাল | প্রধান বিষয় |
|---|---|---|
| চম্পারণ | 1917 | নীলচাষিদের তিনকাঠিয়া প্রথা ও বাগানমালিকের শোষণ |
| আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট | 1918 | শ্রমিকের মজুরি ও প্লেগ বোনাস |
| খেড়া সত্যাগ্রহ | 1918 | ফসলহানির বছরে রাজস্ব মকুব |
এই আন্দোলনগুলিতে তদন্ত, আলোচনা, জনসংগঠন এবং অহিংস চাপ একত্রে ব্যবহৃত হয়।
রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালা বাগ
1919 সালের রাওলাট আইন বিচার ছাড়া আটকসহ যুদ্ধকালীন দমনমূলক ক্ষমতা বহাল রাখে। এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিবাদ হয়। 13 এপ্রিল 1919 অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালা বাগে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। সরকারি হিসাবে 379 জন নিহত হলেও ভারতীয় অনুসন্ধানে সংখ্যা বেশি ধরা হয়। ঘটনাটি ব্রিটিশ ন্যায়বিচারের দাবির ওপর আস্থা গভীরভাবে নষ্ট করে।
খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন (Non-Cooperation Movement)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অটোমান খলিফার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে মুহাম্মদ আলি ও শওকত আলি খিলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। গান্ধী হিন্দু–মুসলমান ঐক্যের সুযোগ হিসেবে এর সঙ্গে অসহযোগকে যুক্ত করেন। 1920 সালে শুরু হওয়া আন্দোলনে উপাধি ত্যাগ, সরকারি বিদ্যালয়–আদালত বর্জন, বিদেশি কাপড় বর্জন এবং চরকা ব্যবহারের আহ্বান ছিল।
অসহযোগে জনসমাজের অংশগ্রহণ
| অঞ্চল বা গোষ্ঠী | আন্দোলনের স্থানীয় অর্থ |
|---|---|
| আওধের কৃষক | খাজনা, বেগার ও তালুকদারি শোষণের বিরোধ |
| গুডেম পাহাড়ের আদিবাসী | বনবিধি ও জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে; আল্লুরি সীতারাম রাজুর নেতৃত্ব |
| আসামের বাগানশ্রমিক | চলাচলের বাধা ভেঙে নিজ গ্রামে ফেরার চেষ্টা |
| শহুরে ছাত্র–আইনজীবী | সরকারি প্রতিষ্ঠান বর্জন |
| ব্যবসায়ী | বিদেশি পণ্যের বয়কট ও দেশীয় শিল্পের সমর্থন |
স্থানীয় মানুষ ‘স্বরাজ’কে নিজেদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী জমি, বন, কম খাজনা বা মর্যাদার মুক্তি হিসেবে কল্পনা করতেন।
চৌরিচৌরা ও আন্দোলন প্রত্যাহার
5 ফেব্রুয়ারি 1922 উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরায় সংঘর্ষের পরে জনতা থানায় আগুন দিলে 22 জন পুলিশ নিহত হন। অহিংস শৃঙ্খলা ভেঙে গেছে মনে করে গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। এই সিদ্ধান্তে বহু নেতা হতাশ হন এবং আন্দোলনের কৌশল নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়।
স্বরাজ পার্টি ও গঠনমূলক কর্মসূচি
চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু 1923 সালে স্বরাজ পার্টি গড়ে আইন পরিষদে প্রবেশ করে ঔপনিবেশিক শাসনকে ভেতর থেকে বাধা দেওয়ার নীতি নেন। অন্যদিকে গান্ধীয় কর্মীরা চরকা, খাদি, গ্রামোন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং অস্পৃশ্যতা বিলোপের কাজে জোর দেন।
সাইমন কমিশন ও নেহরু রিপোর্ট
1927 সালে নিযুক্ত সাইমন কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য ছিল না। 1928 সালে ভারতে এলে ‘সাইমন গো ব্যাক’ স্লোগানে বিক্ষোভ হয়। মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে নেহরু রিপোর্ট ডোমিনিয়ন মর্যাদাসহ সাংবিধানিক কাঠামোর প্রস্তাব দেয়। পূর্ণ স্বাধীনতা নাকি ডোমিনিয়ন মর্যাদা—এই প্রশ্ন জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র হয়।
পূর্ণ স্বরাজ
1929 সালের লাহোর অধিবেশনে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজকে লক্ষ্য ঘোষণা করে। 26 জানুয়ারি 1930 স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। পরে স্বাধীন ভারতের সংবিধান (Constitution) 26 জানুয়ারি 1950 কার্যকর করার মাধ্যমে দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সংরক্ষণ করা হয়।
ডান্ডি অভিযান ও আইন অমান্য
12 মার্চ 1930 গান্ধী সাবরমতী আশ্রম থেকে 78 জন সহযাত্রী নিয়ে ডান্ডির উদ্দেশে যাত্রা করেন। 6 এপ্রিল সমুদ্রের লবণ তৈরি করে লবণ আইন ভাঙেন। লবণের ওপর কর ধনী–দরিদ্র সবাইকে প্রভাবিত করত বলে এটি শক্তিশালী প্রতীক হয়। দেশজুড়ে লবণ আইন ভাঙা, বন আইন অমান্য, বিদেশি কাপড় ও মদের দোকানে পিকেটিং এবং কোথাও রাজস্ব না দেওয়ার কর্মসূচি চলে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| যাত্রা শুরু | 12 মার্চ 1930, সাবরমতী আশ্রম |
| গন্তব্য | ডান্ডি, গুজরাট উপকূল |
| আইন ভঙ্গ | 6 এপ্রিল 1930 |
| প্রতীক | ঔপনিবেশিক লবণ একচেটিয়া ও কর |
| বিস্তার | আইন অমান্য আন্দোলনের সর্বভারতীয় সূচনা |
গান্ধী–আরউইন চুক্তি ও গোলটেবিল বৈঠক
1931 সালের গান্ধী–আরউইন চুক্তিতে কংগ্রেস আইন অমান্য স্থগিত করে এবং গান্ধী দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন। সরকার অহিংস রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তিসহ কিছু ছাড় দেয়। লন্ডনের বৈঠকে সংবিধান, দেশীয় রাজ্য ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বে ঐকমত্য হয়নি। ফিরে এসে আন্দোলন পুনরায় শুরু হলেও কঠোর দমনে তা দুর্বল হয়।
কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন
জাতীয় আন্দোলনের পাশাপাশি কৃষক সভা, ট্রেড ইউনিয়ন ও বামপন্থী সংগঠন জমি, খাজনা, মজুরি ও কাজের অধিকারের দাবি তোলে। 1920 সালে অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস এবং 1936 সালে অল ইন্ডিয়া কিষান সভা গঠিত হয়। বারদৌলি সত্যাগ্রহে 1928 সালে বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে কৃষকেরা রাজস্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সফল আন্দোলন করেন।
নারী ও জাতীয় আন্দোলন
নারীরা স্বদেশি বয়কট, খাদি, সভা, পিকেটিং, লবণ আইন ভাঙা, গোপন বার্তা এবং কারাবরণে অংশ নেন। সরোজিনী নাইডু, কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়, বাসন্তী দেবী, অরুণা আসফ আলী, উষা মেহতা, সুচেতা কৃপালনী, মাতঙ্গিনী হাজরা এবং ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সাহগল পরিচিত নাম; তাদের পাশাপাশি অসংখ্য গ্রামীণ ও শহুরে নারী সক্রিয় ছিলেন।
বিপ্লবী আন্দোলনের নতুন পর্যায়
ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, সুখদেব ও রাজগুরু হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 1928 সালে লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধে স্যান্ডার্স নিহত হন। 1929 সালে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত কেন্দ্রীয় আইনসভায় প্রাণহানি এড়িয়ে বোমা নিক্ষেপ করে আত্মসমর্পণ করেন। বিচারকে তাঁরা ঔপনিবেশিকতা (Colonialism) ও সমাজতন্ত্রের বার্তা প্রচারের মঞ্চ বানান। 23 মার্চ 1931 ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর ফাঁসি হয়।
সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ
সুভাষচন্দ্র বসু 1938 ও 1939 সালে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন; মতবিরোধের পরে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাসবিহারী বসুর উদ্যোগে গঠিত ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। ‘দিল্লি চলো’ আহ্বানে বাহিনী ইম্ফল–কোহিমা সীমান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হলেও পরাজিত হয়। যুদ্ধের পরে আইএনএ বিচার ভারতীয় জনমত (Public Opinion) ও সশস্ত্র বাহিনীতে গভীর আলোড়ন তোলে।
ভারত ছাড়ো আন্দোলন (Quit India Movement)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়দের মতামত ছাড়া ব্রিটিশ সরকার ভারতকে যুদ্ধে যুক্ত করে। ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতার পরে 8 আগস্ট 1942 বোম্বাইয়ে কংগ্রেস ‘ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব গ্রহণ করে। গান্ধী ‘করো অথবা মরো’ আহ্বান জানান। পরদিনই শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হন; ফলে স্থানীয় নেতা, ছাত্র, নারী ও সাধারণ মানুষ আন্দোলন চালান। ধর্মঘট, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা এবং বালিয়া, তামলুক ও সাতারায় সমান্তরাল প্রশাসনের চেষ্টা দেখা যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়
যুদ্ধ অর্থনীতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং 1943 সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ জনজীবনে গভীর সংকট আনে। 1946 সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ, শ্রমিক বিক্ষোভ, আইএনএ বিচার এবং যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের চাপ বাড়ায়। একই সময়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়।
পাকিস্তানের দাবি ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি
1940 সালের লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’-এর কথা বলা হয়; পরে এটি পাকিস্তান দাবির ভিত্তি হয়। 1946 সালের নির্বাচনে মুসলিম আসনে লীগের সাফল্য দাবি শক্তিশালী করে। ক্যাবিনেট মিশনের যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। 16 আগস্ট 1946 প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের পর কলকাতা এবং পরে নোয়াখালি, বিহার, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে।
স্বাধীনতা ও দেশভাগ
3 জুন 1947 মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনায় ব্রিটিশ ভারতকে ভারত ও পাকিস্তানে ভাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ব্রিটিশ সংসদে 18 জুলাই 1947 অনুমোদিত হয়। পাকিস্তান 14 আগস্ট এবং ভারত 15 আগস্ট স্বাধীন হয়। দেশভাগে পাঞ্জাব ও বাংলা বিভক্ত হয়; প্রায় দেড় কোটি মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেন এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।
গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| 1885 | ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা |
| 1905 | বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলন |
| 1906 | মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা |
| 1907 | কংগ্রেসের সুরাট বিভাজন |
| 1916 | হোম রুল, লক্ষ্ণৌ চুক্তি |
| 1917–1918 | চম্পারণ, আহমেদাবাদ ও খেড়া আন্দোলন |
| 1919 | রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড |
| 1920–1922 | অসহযোগ আন্দোলন |
| 1929 | পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণা |
| 1930 | ডান্ডি অভিযান ও আইন অমান্য আন্দোলন (Civil Disobedience Movement) |
| 1931 | গান্ধী–আরউইন চুক্তি; ভগৎ সিংদের ফাঁসি |
| 1942 | ভারত ছাড়ো আন্দোলন |
| 1943 | আজাদ হিন্দ সরকার |
| 1946 | নৌবিদ্রোহ, ক্যাবিনেট মিশন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা |
| 1947 | স্বাধীনতা ও দেশভাগ |
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভিত্তিক পার্থক্য
| বিষয় | সঠিক তথ্য |
|---|---|
| কংগ্রেস | 1885 সালে প্রতিষ্ঠিত; প্রথম থেকেই গণদল ছিল না |
| সম্পদ বহির্গমন | দাদাভাই নওরোজির অর্থনৈতিক সমালোচনার মূল ধারণা |
| বঙ্গভঙ্গ | 1905 সালে কার্যকর, 1911 সালে রদ |
| স্বদেশি | শুধু বিদেশি কাপড় পোড়ানো নয়; শিক্ষা ও শিল্প নির্মাণও ছিল |
| জালিয়ানওয়ালা বাগ | 13 এপ্রিল 1919, অমৃতসর |
| অসহযোগ ও আইন অমান্য | প্রথমটি সহযোগিতা প্রত্যাহার; দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট আইন প্রকাশ্যে ভাঙা |
| চৌরিচৌরা | 1922 সালের সহিংসতার পরে অসহযোগ প্রত্যাহার |
| পূর্ণ স্বরাজ | 1929 লাহোর অধিবেশনে কংগ্রেসের লক্ষ্য |
| ডান্ডি অভিযান | 12 মার্চ যাত্রা শুরু; 6 এপ্রিল 1930 লবণ আইন ভঙ্গ |
| ভারত ছাড়ো | 1942; নেতাদের গ্রেপ্তারের পরেও বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলন চলে |
| আজাদ হিন্দ ফৌজ | প্রথম উদ্যোগ মোহন সিং ও পরে রাসবিহারী বসু; সুভাষ নেতৃত্ব পুনর্গঠন করেন |
| স্বাধীনতা | ঔপনিবেশিকতার অবসানের সঙ্গে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সংকটও যুক্ত |
আন্দোলনের ইতিহাসে অংশগ্রহণের বৈচিত্র্য
অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে একসঙ্গে “একই কৌশল” বলে লিখবেন না। সময়, নেতৃত্ব, দাবি, অংশগ্রহণ ও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার তুলনাছক বানাতে বলুন। একই আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক, নারী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা এক ছিল না। একজন নেতার বক্তব্যকে সবার উদ্দেশ্য হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।
নিজস্ব কাজ: পাঠ্যবইয়ের বিবরণ থেকে একটি দাবি বেছে নিয়ে তার পক্ষে দুটি প্রমাণ খুঁজুন। স্মৃতিকথা ও সরকারি প্রতিবেদনে একই ঘটনার বর্ণনা ভিন্ন হলে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ উৎস গুনে সত্য স্থির করবেন না; সময়, উদ্দেশ্য ও প্রত্যক্ষতার সীমা দেখুন। কোনো কল্পিত উক্তিকে আসল ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি হিসেবে উপস্থাপন করবেন না।
উৎস ও ব্যবহারসীমা
NCERT: Social Science teacher-development material — ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের প্রমাণভিত্তিক পাঠের নির্দেশনা; নির্দিষ্ট ঘটনার তারিখের বদলে উৎস-পাঠের পদ্ধতির জন্য।
