TET Sampan – বাংলায় সম্পূর্ণ TET প্রস্তুতি
Practice CentreTopic-wise mock tests with explanationsStart practising →
Weekly Mock Tests4 tests
Upper Primary TET - Social Studies / Social Science - History (ইতিহাস)Upper Primary TET - Social Studies / Social Science

দিল্লির সুলতানগণ

দিল্লি সুলতানতের পাঁচ রাজবংশ, ইকতা, রাজস্ব, সেনা, বাজারনীতি, তুঘলক পরিকল্পনা, সমাজ ও স্থাপত্যের সারণি-সমৃদ্ধ বাংলা আলোচনা।

Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team

দিল্লির সুলতানগণ

দিল্লি সুলতানত বলতে সাধারণভাবে 1206 থেকে 1526 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লিকেন্দ্রিক পাঁচটি রাজবংশের শাসনকে বোঝানো হয়। এই তিন শতাব্দীতে একই সীমানার একটি অপরিবর্তিত সাম্রাজ্য (Empire) ছিল না। কোনো সময় শাসন বিস্তৃত হয়েছে, আবার বিদ্রোহ, উত্তরাধিকার-সংঘর্ষ, আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ও বহিরাগত আক্রমণে সংকুচিত হয়েছে। সুলতানতের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ ও রাজাদের নয়; কৃষক, সৈনিক, অশ্বব্যবসায়ী, কারিগর, নগরবাসী, আলেম, সুফি, নারী এবং স্থানীয় প্রধানদের ভূমিকাও এর অংশ।

পাঁচটি রাজবংশের সময়রেখা

রাজবংশসময়কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ শাসক
মামলুক বা দাস বংশ1206–1290কুতুবউদ্দিন আইবক, ইলতুতমিশ, রজিয়া, বলবন
খলজি বংশ1290–1320জালালউদ্দিন খলজি, আলাউদ্দিন খলজি
তুঘলক বংশ1320–1414গিয়াসউদ্দিন তুঘলক, মুহাম্মদ বিন তুঘলক, ফিরোজ শাহ তুঘলক
সৈয়দ বংশ1414–1451খিজর খান, মুবারক শাহ
লোদি বংশ1451–1526বহলুল লোদি, সিকন্দর লোদি, ইব্রাহিম লোদি

1526 সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের কাছে ইব্রাহিম লোদির পরাজয়ের মাধ্যমে দিল্লি সুলতানতের অবসান এবং মুঘল শাসনের সূচনা হয়।

ইতিহাস জানার উৎস

উৎসকী জানা যায়প্রমাণের ধরন
দরবারি ইতিহাসরাজনীতি, যুদ্ধ, বিদ্রোহ ও শাসকের নীতিদরবার ও উচ্চশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল
শিলালিপি (Inscription)নির্মাণ, দান, উপাধি ও তারিখনির্দিষ্ট ঘটনার সীমিত তথ্য
মুদ্রাশাসকের নাম, উপাধি, ধাতু ও কর্তৃত্বের দাবিকোথাও মুদ্রা পাওয়া সরাসরি শাসনের নিশ্চিত প্রমাণ নয়
স্থাপত্যপ্রযুক্তি, সম্পদ, শ্রম ও রাজকীয় প্রতীকপরবর্তী মেরামত ও সংযোজন আলাদা করতে হয়
ভ্রমণবৃত্তান্তনগর, পথ, সমাজ ও দরবারভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা নির্বাচিত ও ব্যক্তিগত
আঞ্চলিক সাহিত্যস্থানীয় সমাজ, ভাষা ও স্মৃতিকাব্যিক কল্পনা ও ঐতিহাসিক তথ্য পৃথক করতে হয়

মিনহাজ-উস-সিরাজ, জিয়াউদ্দিন বারানি, আমির খুসরো ও শামস-ই-সিরাজ আফিফের মতো লেখকের রচনা মূল্যবান। তবে তাঁদের বক্তব্য সামাজিক অবস্থান, পৃষ্ঠপোষক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত।

দিল্লি কেন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হল

কারণব্যাখ্যা
ভৌগোলিক অবস্থানউত্তর-পশ্চিমের প্রবেশপথ ও গঙ্গা–যমুনা সমভূমির সংযোগে অবস্থান
কৃষিজ সম্পদদোয়াব অঞ্চলের উর্বর জমি থেকে রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ
পথসংযোগলাহোর, মুলতান, রাজস্থান ও গঙ্গা উপত্যকার সঙ্গে যোগাযোগ (Communication)
পূর্ববর্তী রাজনৈতিক গুরুত্বতোমর ও চাহমান শাসকদের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নগরাঞ্চল
সামরিক সুবিধাদুর্গ, সেনাছাউনি ও পথ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ

দিল্লি সব সময় একমাত্র রাজধানী ছিল না। শাসকেরা সিরি, তুঘলকাবাদ, জাহানপনা ও ফিরোজাবাদের মতো নতুন নগর নির্মাণ করেন; কখনও লাহোর, দৌলতাবাদ বা অন্য কেন্দ্রও গুরুত্বপূর্ণ হয়।

মামলুক ও দাস-সৈনিক

‘মামলুক’ অর্থ ক্রয়কৃত সামরিক দাস। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বহু রাজদরবারে অল্পবয়সী দাসদের সামরিক ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বিশ্বস্ত কর্মকর্তা করা হত। তাঁদের কেউ উচ্চ পদে উঠে শাসকও হয়েছেন।

কুতুবউদ্দিন আইবক ছিলেন মুহাম্মদ ঘোরির মামলুক ও সেনাপতি। ঘোরির মৃত্যুর পরে তিনি উত্তর ভারতে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইলতুতমিশ প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে সুলতানতকে সুসংহত করেন।

ইলতুতমিশের অবদান

ক্ষেত্রঅবদান
রাজনৈতিক সংহতিপ্রতিদ্বন্দ্বী তুর্কি প্রধান ও আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা
দিল্লির মর্যাদাদিল্লিকে স্থায়ী রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে সুদৃঢ় করা
ইকতা ব্যবস্থাকর্মকর্তাদের রাজস্বভিত্তিক দায়িত্বের সংগঠন
মুদ্রারৌপ্য টঙ্কা ও তাম্র জিতলের প্রচলনকে সুসংহত করা
উত্তরাধিকারকন্যা রজিয়াকে যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে মনোনয়নের চেষ্টা
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিআব্বাসীয় খলিফার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ

খলিফার স্বীকৃতি মর্যাদা বাড়িয়েছিল, কিন্তু দিল্লির কার্যকর ক্ষমতা সেনা, রাজস্ব ও স্থানীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর দাঁড়িয়েছিল।

রজিয়া: ক্ষমতা ও লিঙ্গ

রজিয়া 1236 থেকে 1240 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। সমকালীন ইতিহাসকার মিনহাজ-উস-সিরাজ তাঁর যোগ্যতা স্বীকার করলেও নারী হওয়াকে শাসনের বাধা হিসেবে দেখেছিলেন। রজিয়া পর্দার আড়াল থেকে নয়, প্রকাশ্যে দরবার ও সামরিক নেতৃত্বে অংশ নেন।

রজিয়ার সমস্যার ক্ষেত্রব্যাখ্যা
তুর্কি অভিজাতের বিরোধিতাতাঁরা নিজেদের প্রভাব রক্ষা করতে চেয়েছিলেন
লিঙ্গভিত্তিক ধারণানারীকে স্বাধীন সার্বভৌম হিসেবে মানতে অনীহা
কর্মকর্তার নিয়োগনিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠী তৈরির চেষ্টা বিরোধ বাড়ায়
প্রাদেশিক বিদ্রোহকেন্দ্রের দুর্বলতা কাজে লাগানো হয়

তাঁর পতনকে শুধু ‘নারী হওয়ার ব্যর্থতা’ বলা ভুল। অভিজাতদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সামরিক বিদ্রোহ ও সীমিত রাজনৈতিক ভিত্তিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বলবন ও রাজকীয় কর্তৃত্ব

বলবন আগে শক্তিশালী অভিজাত ও নায়েব ছিলেন; পরে সুলতান (Sultan) হন। তিনি দরবারি শৃঙ্খলা, গুপ্তচরব্যবস্থা, সীমান্তরক্ষা এবং বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে রাজকীয় মর্যাদা জোরদার করেন।

অভিজাতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা → কঠোর দরবারি শৃঙ্খলা → সুলতানের দূরত্ব ও মহিমা → কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব শক্ত করার চেষ্টা

শাসকের কঠোরতার দাবি দরবারি আদর্শের অংশ। বাস্তবে দূরবর্তী প্রদেশে স্থানীয় কর্মকর্তা ও প্রধানদের সহযোগিতা জরুরি ছিল।

ইকতা ব্যবস্থা

ইকতা ছিল কোনো কর্মকর্তা বা সেনানায়ককে নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মুক্তি বা ইক্তাদার বলা হত। ইকতা সাধারণভাবে ব্যক্তিগত, চিরস্থায়ী জমির মালিকানা ছিল না।

সুলতানের নিয়োগ → মুক্তির রাজস্ব সংগ্রহ → সৈন্য ও প্রশাসনের ব্যয় → উদ্বৃত্ত কেন্দ্রে প্রেরণ → হিসাব ও বদলি

মুক্তির দায়িত্বকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণের উপায়
রাজস্ব সংগ্রহআয়-ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা
সৈন্য রক্ষণসৈন্য ও ঘোড়ার যাচাই
আইনশৃঙ্খলাঅভিযোগ ও কর্মকর্তার প্রতিবেদন
নির্ধারিত অর্থ কেন্দ্রে পাঠানোসময়ে সময়ে বদলি

ইকতা, ভূমিদান ও আধুনিক ব্যক্তিগত সম্পত্তি এক নয়। ইকতা ছিল মূলত রাজস্ব ও প্রশাসনিক দায়িত্ব; তার রূপ সময়ের সঙ্গে বদলেছে।

অভিজাত ও শাসকের সম্পর্ক

সুলতান একা শাসন করতেন না। তুর্কি, আফগান, ভারতীয় মুসলমান, ধর্মান্তরিত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন জাতিগত উৎসের সামরিক-প্রশাসনিক অভিজাতরা দরবারে ছিলেন। শাসক নতুন লোককে উচ্চপদে তুললে পুরোনো গোষ্ঠীর বিরোধ তৈরি হতে পারত।

শাসকের প্রয়োজনঅভিজাতের প্রয়োজন
বিশ্বস্ত সেনাপতি ও কর্মকর্তাপদ, ইকতা, মর্যাদা ও আয়
বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণনিজস্ব অনুসারী ও আঞ্চলিক ভিত্তি
নিয়মিত রাজস্বকেন্দ্রের কাছ থেকে স্বীকৃতি

এই পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্যেই সহযোগিতা ও সংঘর্ষ দুটিই চলত।

খলজিদের উত্থান

1290 সালে খলজি বংশ ক্ষমতায় আসে। এটি দিল্লির উচ্চ তুর্কি অভিজাতদের একচেটিয়া দাবিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আলাউদ্দিন খলজি উত্তর-পশ্চিমে মঙ্গোল আক্রমণ প্রতিরোধ, রাজস্থান ও গুজরাটে অভিযান এবং দাক্ষিণাত্যে সেনা পাঠানোর মাধ্যমে বিপুল সম্পদ ও রাজনৈতিক মর্যাদা অর্জন করেন।

অভিযানের ধরনউদাহরণফলের প্রকৃতি
সরাসরি সংযুক্তিগুজরাট ও রাজস্থানের কিছু অঞ্চলপ্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
দুর্গ দখলরণথম্ভোর ও চিতোরসামরিক পথ ও মর্যাদা
দাক্ষিণাত্যের অভিযানদেবগিরি, ওয়ারঙ্গল, দ্বারসমুদ্র ও মাদুরাইবিপুল উপহার, কর ও আনুগত্য; সব স্থানে একই রকম প্রত্যক্ষ শাসন নয়

মালিক কাফুরের দাক্ষিণাত্য অভিযানকে পুরো দক্ষিণ ভারত স্থায়ীভাবে জয় বলা যায় না। বহু শাসককে করদ সম্পর্কের মধ্যে রাখা হয়েছিল।

মঙ্গোল আক্রমণ ও সামরিক ব্যবস্থা

আলাউদ্দিনের সময় মঙ্গোল বাহিনী একাধিকবার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও দিল্লির দিকে আসে। বড় স্থায়ী সেনা রাখার প্রয়োজন বাড়ে। সেনাবাহিনীর ঘোড়া ও সৈন্যের ভুয়ো সংখ্যা দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণ চালু হয়।

ব্যবস্থাউদ্দেশ্য
দাগঘোড়ায় সরকারি চিহ্ন দিয়ে মান ও পরিচয় যাচাই
চেহরাসৈনিকের বর্ণনামূলক নথি রাখা
নগদ বেতনকেন্দ্রের সঙ্গে সৈন্যের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বাড়ানো
সীমান্ত দুর্গমঙ্গোল অগ্রযাত্রা প্রতিরোধ
গুপ্তচর ও সংবাদকর্মকর্তা, বাজার ও সেনার ওপর নজর

বাজার নিয়ন্ত্রণ

বড় সেনাকে তুলনামূলক সীমিত বেতনে রক্ষা করতে আলাউদ্দিন খাদ্য, কাপড়, ঘোড়া ও দৈনন্দিন পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। দিল্লিতে পৃথক বাজার, সরকারি নির্ধারিত দাম, ব্যবসায়ীর নিবন্ধন, শস্যভাণ্ডার এবং কঠোর পর্যবেক্ষণ ছিল।

ব্যবস্থাউদ্দেশ্যবাস্তব সমস্যা
নির্ধারিত মূল্যসৈন্যের বেতনের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখাগোপন বিক্রি ও মজুতদারি
ব্যবসায়ীর নিবন্ধনসরবরাহ ও লেনদেন পর্যবেক্ষণপ্রশাসনিক কঠোরতা দরকার
শস্যভাণ্ডারদুর্ভিক্ষ বা ঘাটতিতে সরবরাহপরিবহণ (Transport) ও সংরক্ষণের ব্যয়
গুপ্ত সংবাদনিয়মভঙ্গ শনাক্ত করাভয় ও শাস্তিনির্ভর ব্যবস্থা
ঘোড়া যাচাইনিম্নমান ও অতিরিক্ত দাম ঠেকানোবিস্তৃত পরীক্ষা দরকার

এটি সমগ্র উপমহাদেশের সব বাজারে একইভাবে কার্যকর ছিল না; প্রধানত দিল্লি ও সেনাসংক্রান্ত সরবরাহে কঠোরতা বেশি ছিল। আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পরে ব্যবস্থাটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

দোয়াবের রাজস্বনীতি

গঙ্গা–যমুনা দোয়াবের উর্বর জমি থেকে আলাউদ্দিন অধিক রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। খুত, মুকদ্দম ও চৌধুরীর মতো স্থানীয় গ্রামীণ প্রধানদের বিশেষ সুবিধা কমানোর চেষ্টা হয়। জমি মাপ ও উৎপাদনের অংশ নির্ধারণ কেন্দ্রীয় আয় বাড়াতে সাহায্য করলেও কৃষকের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারত।

কৃষিজ উৎপাদন → রাষ্ট্রের নির্ধারিত অংশ → সংগ্রাহক ও পরিবহণ → সেনা ও প্রশাসনের ব্যয়

রাজস্বের ঘোষিত হার ও বাস্তবে কৃষকের দেওয়া মোট বোঝা এক নাও হতে পারে; অতিরিক্ত আদায়, স্থানীয় দাবি ও ফসলের অবস্থাও বিবেচ্য।

মুহাম্মদ বিন তুঘলক: উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সমস্যা

মুহাম্মদ বিন তুঘলক বিস্তৃত রাজ্য, বড় সেনা ও নতুন প্রশাসনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁকে শুধু ‘পাগল’ বা ‘অদ্ভুত’ বলা ইতিহাসসম্মত নয়। বহু পরিকল্পনার পেছনে যুক্তি ছিল, কিন্তু সময়, বাস্তবায়ন, যোগাযোগ, বিরোধ ও পরিবেশগত সমস্যায় গুরুতর ব্যর্থতা ঘটে।

পরিকল্পনাউদ্দেশ্যসমস্যার কারণ ও ফল
দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে কেন্দ্র স্থানান্তরদাক্ষিণাত্যের কাছে অবস্থান ও বিস্তৃত রাজ্যে নিয়ন্ত্রণদীর্ঘ যাত্রা, মানুষের কষ্ট, প্রশাসনিক অসুবিধা; পরে প্রত্যাবর্তন
তামার প্রতীকী মুদ্রারৌপ্যের অভাব সামলানো ও মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধিসহজে নকল; সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল; প্রত্যাহার
দোয়াবে রাজস্ব বৃদ্ধিরাজকোষের আয় বাড়ানোদুর্ভিক্ষ ও কঠোর আদায়ে কৃষকের সংকট ও বিদ্রোহ
খোরাসান অভিযানের প্রস্তুতিপশ্চিমে প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনাঅভিযান না হওয়ায় বড় সেনার ব্যয়
কারাচিল অভিযানহিমালয়সংলগ্ন পথে কর্তৃত্বকঠিন ভূপ্রকৃতি, আবহাওয়া (Weather) ও সরবরাহের সমস্যা

প্রতীকী মুদ্রা নিজে অবৈজ্ঞানিক ধারণা নয়; সাফল্যের জন্য রাষ্ট্রের নকলরোধ, গ্রহণযোগ্যতা ও বিনিময়ব্যবস্থা দরকার।

রাজধানী স্থানান্তর: একটি সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা

উদ্দেশ্য → বিস্তৃত রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ

ভুল হিসাব → দূরত্ব, জল ও জনজীবনের চাপ

ফল → প্রত্যাবর্তন এবং নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়

ফিরোজ শাহ তুঘলক

ফিরোজ শাহ তুঘলক যুদ্ধের বদলে জনকার্য, খাল, বাগান, নগর ও ভবন নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি কিছু কর বাতিল বা নিয়মিত করেন এবং বংশানুক্রমিক পদ ও ইকতার প্রবণতা বাড়তে দেন। এর ফলে অভিজাতের সমর্থন মিললেও কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে।

ক্ষেত্রউদ্যোগ বা বৈশিষ্ট্য
সেচযমুনা ও শতদ্রু অঞ্চল থেকে খাল নির্মাণ ও সংস্কার
নগরফিরোজাবাদ, হিসার ও অন্যান্য কেন্দ্র
স্থাপত্যফিরোজ শাহ কোটলা; পুরোনো স্তম্ভ স্থানান্তর
দপ্তরদাতব্য ও দাসসংক্রান্ত আলাদা বিভাগ
উত্তরাধিকারপদ ও ইকতা বংশানুক্রমিক হওয়ার প্রবণতা

খাল নির্মাণ কৃষিতে সহায়ক হলেও তার কার্যকারিতা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ভূপ্রকৃতি ও জলপ্রবাহের ওপর নির্ভর করত।

তিমুরের আক্রমণ ও সুলতানতের সংকোচন

1398 সালে তিমুর দিল্লি আক্রমণ ও লুণ্ঠন করেন। ব্যাপক প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষতি এবং রাজনৈতিক মর্যাদার পতন ঘটে। তবে তুঘলক শাসন আগেই প্রাদেশিক বিদ্রোহ ও আঞ্চলিক রাজ্যের উত্থানে দুর্বল হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় দুর্বলতা + প্রাদেশিক স্বাধীনতা + উত্তরাধিকার-সংঘর্ষ + তিমুরের আক্রমণ → দিল্লির কর্তৃত্বের তীব্র সংকোচন

সৈয়দ ও লোদি

তিমুর-পরবর্তী সময়ে সৈয়দ বংশ সীমিত অঞ্চলে শাসন করে। পরে আফগান লোদি বংশ ক্ষমতা দখল করে। লোদিদের রাজনৈতিক কাঠামোয় আফগান প্রধানদের গোষ্ঠীগত মর্যাদা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সুলতান ও অভিজাতের মধ্যে সমতার প্রত্যাশা কেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করতে পারত।

লোদি শাসকগুরুত্বপূর্ণ দিক
বহলুল লোদিআফগান প্রধানদের সহযোগিতায় ক্ষমতা বিস্তার
সিকন্দর লোদিপ্রশাসনিক সংহতি; আগ্রা নগরের গুরুত্ব বৃদ্ধি
ইব্রাহিম লোদিঅভিজাতদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা; বিরোধ ও বিদ্রোহ; বাবরের কাছে পরাজয়

কৃষক, গ্রামীণ প্রধান ও রাষ্ট্র

সুলতানতের অধিকাংশ মানুষের জীবন গ্রামে। কৃষিজ উদ্বৃত্ত রাজকোষের প্রধান ভিত্তি ছিল। রাষ্ট্র সব কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি একই পদ্ধতিতে কর নিত না; মুক্তি, আমিল, স্থানীয় প্রধান ও জমিদারসদৃশ মধ্যবর্তী শক্তি যুক্ত থাকত।

পক্ষস্বার্থ বা ভূমিকা
কৃষকপরিবার চালিয়ে কর দেওয়ার মতো উৎপাদন বজায় রাখা
গ্রামীণ প্রধানস্থানীয় কর্তৃত্ব, অংশ ও বিশেষাধিকার রক্ষা
রাজস্বকর্মীনির্ধারিত রাজস্ব সংগ্রহ ও হিসাব
সুলতানসেনা ও প্রশাসনের জন্য নিয়মিত আয়

অতিরিক্ত দাবি, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ বা সংগ্রাহকের অত্যাচার কৃষককে জমি ছাড়া, উৎপাদন লুকানো বা বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিতে পারত।

নগর, কারিগর ও বাণিজ্য

দিল্লি, লাহোর, মুলতান, লখনৌতি, দৌলতাবাদ ও অন্যান্য নগরে দরবার, সেনা, বাজার, কারখানা ও নির্মাণের চাহিদা ছিল। কাগজের বিস্তার নথি ও বই তৈরিতে পরিবর্তন আনে। চরকা, উন্নত তাঁত, ধাতুকাজ, চামড়া, অস্ত্র ও নির্মাণে নানা কারিগরি ব্যবহৃত হত।

নগর বৃদ্ধির চালিকাফল
দরবার ও সেনাখাদ্য, কাপড়, অস্ত্র ও বিলাসপণ্যের চাহিদা
মুদ্রা ও বাজারদূরপাল্লার বিনিময় সহজতর
নির্মাণপাথরশিল্পী, রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিকের কাজ
পথ ও সরাইবণিক, যাত্রী ও সংবাদ চলাচল

সব অঞ্চলে সমান নগরায়ণ (Urbanisation) হয়নি এবং যুদ্ধের সময় নগর ধ্বংস বা জনশূন্যও হতে পারত।

স্থাপত্য ও নির্মাণপ্রযুক্তি

প্রথম দিকের সুলতানত স্থাপত্যে স্থানীয় কারিগর, পূর্ববর্তী নির্মাণের উপাদান এবং পশ্চিম ও মধ্য এশীয় রীতির মিলন ঘটে। প্রকৃত খিলান ও গম্বুজ নির্মাণে কীলকাকৃতি পাথর এমনভাবে বসানো হয় যাতে ভার দুই পাশে নেমে যায়। প্রথমদিকে ধাপে এগিয়ে দেওয়া পাথরের টোডা পদ্ধতিও ব্যবহৃত হয়।

নির্মাণ বা রীতিবৈশিষ্ট্য
কুওয়াত-উল-ইসলাম মসজিদপ্রথম দিকের মসজিদ; পুনর্ব্যবহৃত স্তম্ভ ও স্থানীয় কারুকাজ
কুতুব মিনারবিজয়, ধর্মীয় মর্যাদা ও আজানের মিনার—বহুমুখী প্রতীক
আলাই দরওয়াজাসুগঠিত প্রকৃত খিলান, গম্বুজ ও জ্যামিতিক অলংকরণ
তুঘলকাবাদঢালু দেয়াল, দুর্গপ্রধান রূপ ও সামরিক ভাব
লোদি সমাধিঅষ্টভুজ বা চতুষ্কোণ পরিকল্পনা; বাগানঘেরা সমাধির বিকাশ

‘ইসলামি স্থাপত্য সম্পূর্ণ বিদেশি’ বা ‘সবই আগের রীতির অনুলিপি’—দুটি ধারণাই ভুল। উপাদান, শ্রম, অলংকরণ ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে নতুন আঞ্চলিক রূপ গড়ে ওঠে।

ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক

সুলতানেরা মুসলমান ছিলেন এবং ধর্মীয় বৈধতার ভাষা ব্যবহার করতেন। তবু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত শুধু ধর্ম দিয়ে নির্ধারিত হত না; রাজস্ব, যুদ্ধ, জোট, স্থানীয় শক্তি ও প্রশাসনিক প্রয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একই শাসকের নীতি সময় ও অঞ্চলে ভিন্ন হতে পারত।

ক্ষেত্রজটিল বাস্তবতা
মন্দির ধ্বংসযুদ্ধ, সম্পদ, রাজনৈতিক প্রতীক ও ধর্মীয় বিরোধ—প্রেক্ষিতভেদে একাধিক কারণ
স্থানীয় কর্মকর্তাবিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক পটভূমির মানুষ প্রশাসনে যুক্ত ছিলেন
জিজিয়াঅমুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ওপর নির্দিষ্ট কর; রূপ ও প্রয়োগ সময়ে বদলেছে
ধর্মীয় দানমসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ ও পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা

একটি ঘটনার ভিত্তিতে সমগ্র সময়কে কেবল সহনশীল বা কেবল অসহিষ্ণু বলা ইতিহাসের জটিলতা নষ্ট করে।

নারী ও ক্ষমতা

রজিয়া সরাসরি সুলতান হলেও রাজপরিবারের অন্যান্য নারীও বিবাহ, উত্তরাধিকার, দান ও দরবারি জোটে ভূমিকা রেখেছেন। সাধারণ নারীরা কৃষি (Agriculture), সুতা কাটা, বয়ন, গৃহশ্রম, বাজার ও নানা পেশায় যুক্ত ছিলেন, কিন্তু দরবারি গ্রন্থে তাঁদের কথা কম। উৎসে অনুপস্থিতি মানে সমাজে ভূমিকা ছিল না—এমন নয়।

সুলতানতের বিস্তার ও সীমা

মানচিত্রে একটি অভিযান দেখালেই স্থায়ী শাসন প্রমাণিত হয় না। কর্তৃত্বের স্তর আলাদা ছিল:

কর্তৃত্বের ধরনলক্ষণ
মূল অঞ্চলনিয়মিত কর্মকর্তা, রাজস্ব ও সেনা
প্রদেশগভর্নর বা মুক্তি; বিদ্রোহের সম্ভাবনা
করদ রাজ্যস্থানীয় শাসক থেকে কর বা উপহার
সাময়িক জয়লুণ্ঠন বা আনুগত্যের দাবি; স্থায়ী প্রশাসন নাও থাকতে পারে
সীমান্তদুর্গ, আলোচনা ও পরিবর্তনশীল নিয়ন্ত্রণ

গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভিত্তিক পার্থক্য

বিষয়সঠিক তথ্য
পাঁচ বংশে একই সীমানার একটানা সাম্রাজ্য ছিলসীমানা ও নিয়ন্ত্রণ বারবার বদলেছে
মামলুক মানেই অদক্ষ গৃহদাসতাঁরা সামরিক ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ পেতেন; কেউ সর্বোচ্চ ক্ষমতায় উঠেছেন
রজিয়া শুধু নারী হওয়ায় ব্যর্থ হনলিঙ্গবৈষম্যের সঙ্গে অভিজাত বিরোধ ও বিদ্রোহও কাজ করেছে
ইকতা ব্যক্তিগত জমির মালিকানাএটি রাজস্ব সংগ্রহ ও প্রশাসনিক দায়িত্বের ব্যবস্থা
আলাউদ্দিনের দাম নিয়ন্ত্রণ সমগ্র দেশে সমান ছিলদিল্লি ও সেনা-সরবরাহকেন্দ্রিক প্রয়োগ বেশি কঠোর ছিল
মুহাম্মদ বিন তুঘলকের প্রতিটি পরিকল্পনা যুক্তিহীনউদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুতর ত্রুটি ছিল
রাজধানী বদলে দিল্লির প্রত্যেক মানুষকে স্থায়ীভাবে সরানো হয়বাধ্যতামূলক স্থানান্তর ব্যাপক কষ্ট দেয়, কিন্তু বিবরণে অতিরঞ্জনও আছে
সুলতানতের স্থাপত্য সম্পূর্ণ বিদেশিস্থানীয় কারিগর ও বহিরাগত রীতির মেলবন্ধনে নতুন রূপ গড়ে ওঠে

PRACTICE QUIZ

Take a Test from This Topic

12. দিল্লির সুলতানগণ — MCQ Test
30 questions

Start quiz →