TET Sampan – বাংলায় সম্পূর্ণ TET প্রস্তুতি
Practice CentreTopic-wise mock tests with explanationsStart practising →
Weekly Mock Tests4 tests
Upper Primary TET - Social Studies / Social Science - History (ইতিহাস)Upper Primary TET - Social Studies / Social Science

নতুন ভাবনা ও দর্শন

উপনিষদীয় অনুসন্ধান, বুদ্ধের শিক্ষা, জৈন ত্রিরত্ন ও মহাব্রত, সংঘ, তুলনামূলক ছক, ধারাচিত্র এবং উৎসসমালোচনার সহজ বাংলা আলোচনা।

Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team

নতুন ভাবনা ও দর্শন

আনুমানিক ষষ্ঠ–পঞ্চম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্ব-তে গঙ্গা সমভূমিতে নতুন নগর, বাণিজ্য, মহাজনপদ (Mahajanapada) ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে ধর্মীয় ও দার্শনিক বহু প্রশ্ন সামনে আসে। বড় যজ্ঞের ব্যয়, জন্মভিত্তিক মর্যাদা, দুঃখ, কর্ম, পুনর্জন্ম, আত্মা, মুক্তি এবং নৈতিক জীবনের পথ নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষক ও গোষ্ঠী আলোচনা করেন। উপনিষদীয় চিন্তা, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, আজীবিক এবং অন্যান্য দর্শন এই বৃহৎ বৌদ্ধিক পরিবেশের অংশ। কোনো একটিকে শুধু অন্যটির “প্রতিক্রিয়া” বললে সময়টির বৈচিত্র্য ধরা পড়ে না।

কেন নতুন প্রশ্ন উঠেছিল

এই যুগে প্রশ্ন ও মতবাদের বিস্তারের কয়েকটি পটভূমি ছিল:

  • নগর, বাজার ও দূরপাল্লার বাণিজ্যের বৃদ্ধি
  • নতুন ধনী গৃহপতি ও বণিকগোষ্ঠীর উত্থান
  • মহাজনপদ, কর ও যুদ্ধের বিস্তার
  • বৈদিক যজ্ঞের জটিলতা ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
  • বর্ণভিত্তিক সামাজিক দাবির বৃদ্ধি
  • বনবাসী তপস্বী ও ভ্রাম্যমাণ শিক্ষকগোষ্ঠীর পরম্পরা
  • জীবন, মৃত্যু, দুঃখ ও পুনর্জন্ম নিয়ে ব্যক্তিগত অনুসন্ধান

সব মানুষ একই কারণে নতুন পথে আকৃষ্ট হননি। রাজা, বণিক, কারিগর, নারী, গৃহী ও সন্ন্যাসজীবী মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ছিল।

শ্রামণ পরম্পরা

গৃহত্যাগী, ভ্রাম্যমাণ সাধক ও তর্কশীল শিক্ষকদের বিস্তৃত ধারাকে শ্রামণ পরম্পরা বলা হয়। তাঁরা কখনও কঠোর তপস্যা, ধ্যান, নৈতিক শৃঙ্খলা বা জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে মুক্তি খুঁজতেন। বৌদ্ধ ও জৈন পরম্পরা এই বৃহৎ জগতের অংশ, কিন্তু তাদের মতবাদ এক নয়।

শ্রামণ গোষ্ঠী সব বৈদিক পরম্পরা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিল—এমন নয়; মতের আদানপ্রদান, বিতর্ক ও পারস্পরিক প্রভাব ছিল।

উপনিষদীয় অনুসন্ধান

উপনিষদ বৈদিক সাহিত্যের পরবর্তী অংশের সঙ্গে যুক্ত দর্শনমূলক রচনা। এগুলি দীর্ঘ সময়ে রচিত ও সংকলিত হয়েছে। “গুরুর নিকটে বসা” অর্থের সঙ্গে শব্দটির ব্যাখ্যা যুক্ত হলেও উপনিষদ মূলত বাস্তবতার গভীর স্বরূপ, আত্মা, কর্ম ও মুক্তি নিয়ে সংলাপ ও চিন্তা প্রকাশ করে।

প্রধান ধারণা:

  • আত্মন: ব্যক্তির গভীর আত্মসত্তা সম্পর্কে ধারণা
  • ব্রহ্মন: চূড়ান্ত বা সর্বব্যাপী বাস্তবতা
  • কর্ম: কাজ ও তার নৈতিক ফল
  • পুনর্জন্ম: জন্ম–মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি
  • মোক্ষ: এই বন্ধন থেকে মুক্তি

সব উপনিষদ একই ভাষায় বা একই মত প্রকাশ করে না। আত্মা ও ব্রহ্ম-এর সম্পর্ক বিভিন্ন সংলাপে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত।

সংলাপ ও প্রশ্নের গুরুত্ব

উপনিষদে বহু ধারণা প্রশ্নোত্তর ও সংলাপের মাধ্যমে এসেছে। গার্গী যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে বাস্তবতার ভিত্তি নিয়ে তর্ক করেন; মৈত্রেয়ী সম্পদ ও অমরত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেন। সত্যকাম জাবাল-এর কাহিনি সত্যবাদিতা ও শিক্ষাগ্রহণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

এই কাহিনিগুলি দেখায় যে প্রশ্ন, যুক্তি ও জ্ঞানান্বেষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে কয়েকজন নারীর উপস্থিতি দেখে সব নারীর সমান শিক্ষার সুযোগ ছিল বলা যাবে না; ব্যতিক্রম ও সাধারণ সামাজিক অবস্থা আলাদা করে দেখতে হয়।

গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও তাৎপর্য

স্থানসম্পর্কস্মরণযোগ্য তাৎপর্য
লুম্বিনীবুদ্ধজন্মস্থানের পরম্পরা
বোধগয়াবুদ্ধবোধিলাভ
সারনাথবুদ্ধপ্রথম ধর্মদেশনা
কুশীনগরবুদ্ধমহাপরিনির্বাণ
বৈশালীমহাবীর ও বৌদ্ধ সংঘবজ্জি অঞ্চল; উভয় পরম্পরায় গুরুত্বপূর্ণ
রাজগৃহবৌদ্ধ ও জৈন পরম্পরাশিক্ষা, সংঘ ও রাজপৃষ্ঠপোষকতার কেন্দ্র

বৌদ্ধ ও জৈন ধারার সংক্ষিপ্ত তুলনা

দিকবৌদ্ধধর্মজৈনধর্ম
পথের প্রকৃতিদুই চরম এড়িয়ে মধ্যমার্গসন্ন্যাসীর ক্ষেত্রে কঠোর সংযম ও তপস্যা
আত্মাঅনাত্মাজীব স্বীকৃত
মূল বিন্যাসচার আর্যসত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গত্রিরত্ন ও পাঁচ মহাব্রত
কর্মউদ্দেশ্যপূর্ণ নৈতিক কর্মের ফলআত্মাকে আবদ্ধকারী সূক্ষ্ম কর্মবন্ধন
সম্প্রদায়ভিক্ষু, ভিক্ষুণী ও গৃহী অনুসারীসন্ন্যাসী, সন্ন্যাসিনী, গৃহী পুরুষ ও গৃহী নারী
ভাষাপালি ও বিভিন্ন প্রাকৃত; পরে অন্যান্য ভাষাঅর্ধমাগধীসহ প্রাকৃত; পরে অন্যান্য ভাষা

গৌতম বুদ্ধ: জীবন ও অনুসন্ধান

সিদ্ধার্থ গৌতম শাক্য গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আনুমানিক পঞ্চম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্ব-তে জীবনযাপন করেন। পরম্পরাগত কালপঞ্জি-তে নির্দিষ্ট জন্ম–মৃত্যুর সাল দেওয়া হলেও আধুনিক গবেষণায় নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে।

তাঁর জীবনের প্রধান স্থান:

  • লুম্বিনী: জন্মস্থানের পরম্পরা
  • কপিলবস্তু: শাক্য অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক
  • বোধগয়া: বোধিলাভ
  • সারনাথ: প্রথম ধর্মদেশনা
  • কুশীনগর: মহাপরিনির্বাণ

সিদ্ধার্থ পরিবার ও সুবিধাপূর্ণ জীবন ত্যাগ করে দুঃখের কারণ ও মুক্তির পথ খুঁজতে বের হন। প্রথমে কঠোর তপস্যা করলেও পরে চরম ভোগ ও চরম আত্মদমন—দুই পথ এড়িয়ে মধ্যমার্গ (মধ্যমার্গ) গ্রহণ করেন। বোধগয়ায় ধ্যান-এর পরে তিনি “বুদ্ধ”—অর্থাৎ জাগ্রত বা বোধিপ্রাপ্ত—নামে পরিচিত হন।

চার আর্যসত্য

বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্রে চার আর্যসত্য (চার আর্যসত্য):

  1. জীবনে দুঃখ বা অসন্তোষ আছে।
  2. তৃষ্ণা, আসক্তি ও অজ্ঞতা দুঃখের কারণ।
  3. কারণ দূর হলে দুঃখের নিবৃত্তি সম্ভব।
  4. অষ্টাঙ্গিক মার্গ সেই নিবৃত্তির পথ।

দুঃখ মানে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়; পরিবর্তনশীল জিনিসকে স্থায়ী ধরে আঁকড়ে থাকার অসন্তোষও বোঝায়। বৌদ্ধধর্মকে “জীবন শুধু দুঃখ”—এই এক বাক্যে হতাশাবাদ বলা ভুল, কারণ শিক্ষা দুঃখের নিবৃত্তির পথও দেখায়।

অষ্টাঙ্গিক মার্গ

আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ (আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ):

  • সম্যক দৃষ্টি (সম্যক দৃষ্টি)
  • সম্যক সংকল্প (সম্যক সংকল্প)
  • সম্যক বাক্য (সম্যক বাক্য)
  • সম্যক কর্ম (সম্যক কর্ম)
  • সম্যক জীবিকা (সম্যক জীবিকা)
  • সম্যক প্রচেষ্টা (সম্যক প্রচেষ্টা)
  • সম্যক স্মৃতি বা সচেতনতা (সম্যক স্মৃতি)
  • সম্যক সমাধি (সম্যক সমাধি)

এগুলি আটটি বিচ্ছিন্ন ধাপ নয়; প্রজ্ঞা (প্রজ্ঞা), নৈতিকতা (নৈতিক আচরণ) ও মানসিক শৃঙ্খলা (মানসিক শৃঙ্খলা)-র সমন্বিত অনুশীলন।

বৌদ্ধ দর্শনের আরও কয়েকটি ধারণা

অনিত্য বোঝায় সব শর্তাধীন বস্তু পরিবর্তনশীল। অনাত্মা স্থায়ী, অপরিবর্তনীয় ব্যক্তিসত্তার ধারণাকে প্রশ্ন করে। প্রতীত্যসমুৎপাদ (প্রতীত্যসমুৎপাদ) বোঝায় ঘটনা কারণ ও শর্তের ওপর নির্ভর করে উদ্ভূত হয়।

নির্বাণ তৃষ্ণা, বিদ্বেষ ও অজ্ঞতার অবসানের সঙ্গে যুক্ত মুক্তি। একে শুধু “মৃত্যু” বা কোনো ভৌগোলিক স্বর্গ বলা ভুল। কর্ম বৌদ্ধ চিন্তায় নৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ কর্মের সঙ্গে যুক্ত; এটি অন্ধ ভাগ্য বা পূর্বনির্ধারণ নয়।

সংঘ ও গৃহী অনুসারী

বুদ্ধের অনুসারীদের সন্ন্যাসী–সন্ন্যাসিনীর সংগঠনকে সংঘ বলা হয়। সদস্যরা শৃঙ্খলাবিধি মেনে ভিক্ষা, ধ্যান, শিক্ষা ও প্রচারে যুক্ত থাকতেন। গৃহী উপাসক–উপাসিকা সংসার না ছেড়েও নৈতিক বিধান মেনে সংঘকে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানে সহায়তা করতেন।

মহাপজাপতি গৌতমী-র অনুরোধের সঙ্গে ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার পরম্পরা যুক্ত। নারী সংঘে প্রবেশের সুযোগ পেলেও তাদের ওপর অতিরিক্ত বিধি আরোপিত ছিল বলে বিনয় পরম্পরা জানায়। এটি সুযোগ ও অসমতার সহাবস্থানের উদাহরণ।

সংঘে জন্মের বদলে দীক্ষা নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবু বাস্তব সমাজের জাতিগত অবস্থান, লিঙ্গ ও সম্পদের পার্থক্য পুরোপুরি অদৃশ্য হয়েছিল—এমন দাবি করা যাবে না। আদর্শ ও বাস্তব অনুশীলন আলাদা করে দেখা দরকার।

ভাষা ও শিক্ষার প্রচার

বুদ্ধ সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত ভাষার নিকটবর্তী ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন বলে পরম্পরা জানায়। প্রাচীন বৌদ্ধ রচনা পালি, বিভিন্ন প্রাকৃত এবং পরে সংস্কৃত, চীনা ও তিব্বতি-এ সংরক্ষিত। পালিকে সরাসরি “বুদ্ধের নিজের একমাত্র ভাষা” বলা নিশ্চিত নয়; এটি একটি সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে ধর্মগ্রন্থসম্ভার সংরক্ষণ করেছে।

বুদ্ধের শিক্ষা প্রথমে মৌখিকভাবে স্মরণ ও আবৃত্তিতে রক্ষিত হয়। বহু পরে বিভিন্ন বৌদ্ধ গোষ্ঠী তা লিখিত করে। তাই গ্রন্থের স্তর, সংকলন ও সম্প্রদায়ভেদে পার্থক্য উৎসসমালোচনা-এর বিষয়।

ত্রিপিটক

থেরবাদ পরম্পরা-এর পালি ধর্মগ্রন্থকে ত্রিপিটক—তিন পিটক—বলা হয়:

  • বিনয় পিটক: সংঘের শৃঙ্খলা
  • সুত্ত পিটক: ধর্মদেশনা ও সংলাপ
  • অভিধম্ম পিটক: বিশ্লেষণমূলক দার্শনিক বিন্যাস

সব অংশ একই সময়ে রচিত নয়। “বুদ্ধ নিজে পুরো ত্রিপিটক লিখেছিলেন”—এটি ভুল; শিক্ষা দীর্ঘ মৌখিক সংরক্ষণ ও সংকলনের ফল।

জৈন পরম্পরা ও তীর্থঙ্কর

জৈন পরম্পরা চব্বিশজন তীর্থঙ্কর-কে স্বীকার করে। তীর্থঙ্কর এমন পথপ্রদর্শক যিনি জন্ম–মৃত্যুর বন্ধন অতিক্রমের পথ দেখান। পার্শ্বনাথ তেইশতম এবং বর্ধমান মহাবীর চব্বিশতম তীর্থঙ্কর। জৈনধর্মকে শুধু মহাবীরের “নতুন প্রতিষ্ঠিত ধর্ম” বলা তাই পরম্পরা-এর দৃষ্টিতে অসম্পূর্ণ; তিনি পূর্ববর্তী ধারাকে পুনর্গঠন ও প্রচার করেন।

মহাবীর বজ্জি অঞ্চলের ক্ষত্রিয় গোষ্ঠী-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আনুমানিক বুদ্ধের সমসাময়িক। ত্রিশ বছর বয়সে গৃহত্যাগ, প্রায় বারো বছরের কঠোর তপস্যার পরে কৈবল্যজ্ঞান লাভ এবং পরে দীর্ঘ প্রচারের কাহিনি জৈন রচনায় সংরক্ষিত। তাঁর নির্দিষ্ট কালপঞ্জি নিয়েও পরম্পরা-ভেদে পার্থক্য আছে।

জৈনধর্মের ত্রিরত্ন

মুক্তির পথে তিন রত্ন:

  • সম্যক দর্শন (সম্যক দর্শন)
  • সম্যক জ্ঞান (সম্যক জ্ঞান)
  • সম্যক চরিত্র (সম্যক চরিত্র)

শুধু জ্ঞান যথেষ্ট নয়; বিশ্বাস, বোঝাপড়া ও আচরণের সমন্বয় দরকার। আত্মা কর্মের সূক্ষ্ম বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং সংযম–তপস্যায় সেই বন্ধন ক্ষয় করে মোক্ষ অর্জন করা যায়—জৈন দর্শনের এই দৃষ্টিভঙ্গি বৌদ্ধ অনাত্মা ধারণা থেকে পৃথক।

পাঁচ মহাব্রত

জৈন সন্ন্যাসীদের পাঁচ মহাব্রত (পাঁচ মহাব্রত):

  1. অহিংসা: কোনো জীবকে আঘাত না করা
  2. সত্য: সত্য বলা
  3. অস্তেয়: না দেওয়া বস্তু না নেওয়া
  4. ব্রহ্মচর্য: সম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়সংযম
  5. অপরিগ্রহ: অধিকার ও আসক্তি ত্যাগ

গৃহী অনুসারীরা একই নীতির অপেক্ষাকৃত সীমিত রূপ বা অনুব্রত পালন করতে পারেন। সন্ন্যাসীর কঠোর বিধি সরাসরি সব গৃহীর ওপর প্রয়োগ হয় না।

অহিংসা, অনেকান্তবাদ ও স্যাদবাদ

অনেকান্তবাদ বলে বাস্তবতার বহু দিক আছে; একটি সীমিত দৃষ্টিকোণ পুরো সত্য ধরে না। স্যাদবাদ শর্তসাপেক্ষ বক্তব্যের পদ্ধতি—“এক নির্দিষ্ট দিক থেকে” কোনো কথা সত্য হতে পারে। একে “সব মতই সমান সত্য” বলা অতিরিক্ত সরলীকরণ; এটি সুশৃঙ্খল দৃষ্টিকোণ ও যুক্তিসঙ্গত শর্তারোপ শেখায়।

জৈন সংঘ ও ভাষা

জৈন সংঘে সন্ন্যাসী, সন্ন্যাসিনী, গৃহী পুরুষ ও গৃহী নারী—চার অংশের সম্প্রদায়ের ধারণা আছে। মহাবীরের শিক্ষা সাধারণ মানুষের ভাষার নিকটবর্তী অর্ধমাগধী প্রাকৃত-এ সংরক্ষিত বলে পরম্পরা জানায়। পরে বহু ভাষায় জৈন সাহিত্য তৈরি হয়।

জৈন আগম দীর্ঘদিন মৌখিকভাবে সংরক্ষিত এবং পরে ধর্মসভায় সংকলিত হয়। দিগম্বর ও শ্বেতাম্বর পরম্পরা-এর ধর্মগ্রন্থসম্ভার, সন্ন্যাসবিধি ও মহাবীরের জীবনের কিছু বিবরণে পার্থক্য আছে। এই মতভেদ ইতিহাসে একাধিক জীবন্ত পরম্পরা বোঝায়।

বৌদ্ধ ও জৈন শিক্ষার মিল

  • দুটিই শ্রামণ পরিবেশের অংশ
  • কর্ম ও পুনর্জন্ম স্বীকার করে, যদিও ব্যাখ্যা ভিন্ন
  • নৈতিক আচরণ ও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেয়
  • জন্মগত মর্যাদার দাবিকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করে
  • সন্ন্যাসী ও গৃহী সম্প্রদায় গড়ে তোলে
  • সাধারণ মানুষের নিকটবর্তী ভাষায় শিক্ষা ছড়ায়
  • রাজা, বণিক, গৃহপতি ও সাধারণ মানুষের পৃষ্ঠপোষকতা পায়

প্রধান পার্থক্য

  • বৌদ্ধধর্ম স্থায়ী আত্মার ধারণা অস্বীকার করে; জৈনধর্ম জীব বা আত্মা স্বীকার করে।
  • বৌদ্ধ মধ্যমার্গ চরম তপস্যা এড়ায়; জৈন সন্ন্যাসে কঠোর তপস্যা কেন্দ্রীয়।
  • কর্ম-র দার্শনিক ব্যাখ্যা দুই পরম্পরা-এ এক নয়।
  • মুক্তির পথ, অধিবিদ্যা, সন্ন্যাসজীবন-সংক্রান্ত শৃঙ্খলা ও ধর্মগ্রন্থে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।

মিল দেখে দুটি ধর্মকে একই বলা যেমন ভুল, তেমনি পার্থক্য দেখে তাদের সামাজিক প্রেক্ষিত ও পারস্পরিক বিতর্ক উপেক্ষা করাও ভুল।

অন্যান্য মতবাদ

এই যুগে আজীবিক শিক্ষকরা নিয়তি বা নির্ধারিত মহাজাগতিক নিয়তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বলে অন্য পরম্পরা-এর গ্রন্থে জানা যায়। মক্খলি গোসাল-র নাম তাদের সঙ্গে যুক্ত।

বিহার, চৈত্য ও স্তূপ

বর্ষাকালে ভ্রাম্যমাণ সন্ন্যাসীদের এক স্থানে থাকার প্রথা থেকে স্থায়ী বিহার গড়ে উঠতে পারে। প্রথমে অস্থায়ী আশ্রয়, পরে ইট, পাথর ও শৈলকর্তিত বিহার তৈরি হয়। বণিক, শাসক, কারিগরগোষ্ঠী, নারী ও পুরুষ দাতা-এর শিলালিপি (Inscription) পৃষ্ঠপোষকতা-এর বিস্তৃতি দেখায়।

স্তূপ সাধারণত পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন বা স্মৃতিচিহ্নের ওপর নির্মিত পবিত্র স্থাপনা। মূল অংশ:

  • অণ্ড: গম্বুজাকার ঢিবি
  • হর্মিকা: উপরের বেষ্টনী-ঘেরা অংশ
  • যষ্টি ও ছত্র
  • বেদিকা (বেষ্টনী)
  • প্রদক্ষিণাপথ

প্রাথমিক বৌদ্ধ শিল্পে বুদ্ধকে কখনও পদচিহ্ন, বৃক্ষ, ধর্মচক্র বা খালি সিংহাসনের মতো প্রতীক-এ বোঝানো হয়েছে।

ভাবনার বিস্তার

শিক্ষা ছড়াতে সাহায্য করে:

  • ভ্রাম্যমাণ শিক্ষক ও সন্ন্যাসী
  • নগর ও বাণিজ্যপথ
  • সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষা
  • সংঘ ও বিহার
  • বণিক ও শাসকের দান
  • মৌখিক আবৃত্তি, গল্প ও সংলাপ

পৃষ্ঠপোষকতা মানে ধর্ম শুধু রাজা তৈরি করেছেন নয়। রাজসমর্থন বিস্তার ও প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু গৃহী অনুসারী, নারী দাতা, বণিক, কারিগর ও স্থানীয় সম্প্রদায়-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভিত্তিক পার্থক্য

  • উপনিষদ একটি ব্যক্তি বা এক সময়ে লিখিত একক বই নয়।
  • বুদ্ধের শিক্ষা শুধু “দুঃখ” নয়; দুঃখের নিবৃত্তির পথ কেন্দ্রীয়।
  • নির্বাণ মানে কেবল মৃত্যু নয়।
  • বৌদ্ধধর্ম কর্ম অস্বীকার করে না; তার ব্যাখ্যা উদ্দেশ্য-এর সঙ্গে যুক্ত।
  • মহাবীর জৈন পরম্পরার প্রথম নয়, চব্বিশতম তীর্থঙ্কর।
  • জৈন অহিংসা শুধু মানুষে সীমিত নয়।
  • গণ–সংঘ ও ধর্মীয় সংঘ এক বিষয় নয়।
  • বুদ্ধ ও মহাবীর নিজে বর্তমান আকারের সব ধর্মগ্রন্থ লিখে যাননি।
  • বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম মিলযুক্ত হলেও আত্মা ও তপস্যা বিষয়ে ভিন্ন।

মূল পরিভাষা

  • শ্রামণ
  • আত্মন ও ব্রহ্মন
  • কর্ম, পুনর্জন্ম ও মোক্ষ
  • চার আর্যসত্য (চার আর্যসত্য)
  • অষ্টাঙ্গিক মার্গ
  • মধ্যমার্গ (মধ্যমার্গ)
  • অনিত্য ও অনাত্মা
  • সংঘ ও নির্বাণ
  • তীর্থঙ্কর ও কৈবল্য
  • ত্রিরত্ন (ত্রিরত্ন)
  • অহিংসা ও অপরিগ্রহ
  • অনেকান্তবাদ

PRACTICE QUIZ

Take a Test from This Topic

06. নতুন ভাবনা ও দর্শন — MCQ Test
30 questions

Start quiz →