প্রথম সাম্রাজ্য
চন্দ্রগুপ্ত, বিন্দুসার, অশোক, মৌর্য প্রশাসন, কলিঙ্গ যুদ্ধ, ধম্ম, শিলালিপি, ভাষা–লিপি, শিল্প ও সাম্রাজ্যের অবসানের ছকসমৃদ্ধ বাংলা আলোচনা।
Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team
প্রথম সাম্রাজ্য (Empire)
মৌর্য সাম্রাজ্য উপমহাদেশের প্রথম বৃহৎ ও সুদূরবিস্তৃত সাম্রাজ্য। আনুমানিক 321 খ্রিস্টপূর্ব-তে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থান থেকে 185 খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ মৌর্য শাসনের অবসান পর্যন্ত এই রাষ্ট্র নানা ভাষা, পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠীকে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করেছিল। তবে “প্রথম সাম্রাজ্য” মানে সমগ্র বর্তমান ভারত একরকম সরাসরি শাসিত ছিল না। সাম্রাজ্যের কেন্দ্র, প্রদেশ, সীমান্ত ও প্রভাবাধীন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ভিন্ন ছিল।
কালানুক্রমের ছক
| সময় | শাসক বা ঘটনা | গুরুত্ব |
|---|---|---|
| আনুমানিক 321 খ্রিস্টপূর্ব | চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের ক্ষমতা দখল | নন্দ শাসনের অবসান ও মৌর্য বংশের সূচনা |
| আনুমানিক 305 খ্রিস্টপূর্ব | সেলিউকাসের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সন্ধি (Sandhi) | উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, কূটনীতি ও দূত বিনিময় |
| আনুমানিক 297–273 খ্রিস্টপূর্ব | বিন্দুসারের শাসন | সাম্রাজ্যের ধারাবাহিকতা ও দক্ষিণমুখী বিস্তার |
| আনুমানিক 268–232 খ্রিস্টপূর্ব | অশোকের শাসন | কলিঙ্গ যুদ্ধ, ধম্মনীতি ও বিস্তৃত শিলালিপি (Inscription) |
| আনুমানিক 261 খ্রিস্টপূর্ব | কলিঙ্গ যুদ্ধ | অশোকের ত্রয়োদশ প্রধান শিলালিপিতে অনুতাপের বিবরণ |
| আনুমানিক 185 খ্রিস্টপূর্ব | শেষ মৌর্য শাসনের অবসান | শুঙ্গ বংশের উত্থান; আঞ্চলিক শক্তির বৃদ্ধি |
তারিখগুলি আনুমানিক। রাজাদের অভিষেক, ক্ষমতা গ্রহণ ও শাসনকাল গণনায় উৎসভেদে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়।
মৌর্য ইতিহাসের প্রধান উৎস
একটি উৎসকে অন্যটির সরল অনুবাদ ভাবা যাবে না। শিলালিপি রাজকীয় ঘোষণার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলেও তার ভাষা উদ্দেশ্যমূলক; সাহিত্যিক কাহিনি পরে রচিত হলেও সামাজিক স্মৃতি জানায়।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থান
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দ বংশকে পরাজিত করে মগধে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন বলে ভারতীয় পরম্পরা জানায়। এই প্রক্রিয়ায় কৌটিল্য বা চাণক্যের ভূমিকার কাহিনি জনপ্রিয়, কিন্তু তার বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তী গ্রন্থে এসেছে। ইতিহাসে কাহিনি, রাজনৈতিক স্মৃতি ও সমকালীন প্রমাণ আলাদা করে বিচার করতে হয়।
আলেকজান্ডারের অভিযানের পরে উত্তর-পশ্চিমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। চন্দ্রগুপ্ত ধীরে ধীরে পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেন এবং পরে মগধকেন্দ্রিক বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়েন।
সেলিউকাসের সঙ্গে সম্পর্ক
আলেকজান্ডারের উত্তরাধিকারী শাসকদের একজন সেলিউকাস প্রথম নিকেটর আনুমানিক 305 খ্রিস্টপূর্ব-তে চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। পরে সন্ধি হয়। গ্রিক–রোমান বিবরণে ভূখণ্ড হস্তান্তর, বৈবাহিক সম্পর্কের চুক্তি এবং সেলিউকাসকে 500 যুদ্ধহস্তী দেওয়ার উল্লেখ আছে। সব শর্তের সঠিক প্রকৃতি নিয়ে গবেষণায় আলোচনা আছে।
মেগাস্থিনিস সেলিউকাসের দূত হিসেবে চন্দ্রগুপ্তের দরবারে আসেন। তাঁর ইন্ডিকা গ্রন্থ হারিয়ে গেছে; পরবর্তী লেখকের উদ্ধৃতি থেকে অংশ জানা যায়। তাই তাঁর সব বিবরণ একইভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। তিনি যা দেখেছেন, যা শুনেছেন এবং যা পরবর্তী লেখক বদলে উদ্ধৃত করেছেন—এই স্তরগুলি আলাদা করতে হয়।
বিন্দুসার
চন্দ্রগুপ্তের পরে তাঁর পুত্র বিন্দুসার সাম্রাজ্যের শাসন করেন। গ্রিক সূত্রে তাঁকে অমিত্রঘাত নামে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সম্ভবত সংস্কৃত “অমিত্রঘাত”—শত্রুনাশক—উপাধির রূপান্তর। দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চল পর্যন্ত মৌর্য প্রভাব তাঁর সময়ে বিস্তৃত হয় বলে ধারণা করা হয়।
বিন্দুসার সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে কম প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে। কম তথ্য মানে তাঁর শাসন গুরুত্বহীন নয়; এটি উৎস সংরক্ষণের অসমতার উদাহরণ। অশোকের বহু শিলালিপি টিকে থাকায় তাঁর সম্পর্কে বেশি জানা যায়।
সাম্রাজ্যের বিস্তার
অশোকের শিলালিপির অবস্থান থেকে মৌর্য সাম্রাজ্যের বিস্তারের একটি ধারণা পাওয়া যায়। উত্তর-পশ্চিমের আফগানিস্তান-সংলগ্ন অঞ্চল থেকে গঙ্গা সমভূমি, ওডিশা, মধ্যভারত, দাক্ষিণাত্যের বড় অংশ এবং কর্ণাটক পর্যন্ত শিলালিপি পাওয়া গেছে।
দক্ষিণের চোল, পাণ্ড্য, সত্যপুত্র ও কেরলপুত্রদের অশোক প্রতিবেশী স্বাধীন শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাই মৌর্য মানচিত্রে বর্তমান উপমহাদেশের প্রতিটি অংশ একই রঙে দেখানো বিভ্রান্তিকর। শিলালিপি পাওয়া অঞ্চল, সরাসরি প্রদেশ, করদ এলাকা ও কূটনৈতিক প্রভাব এক বিষয় নয়।
কেন্দ্র ও প্রাদেশিক রাজধানী
| কেন্দ্র | আনুমানিক অঞ্চল | সম্ভাব্য প্রশাসনিক গুরুত্ব |
|---|---|---|
| পাটলিপুত্র | মধ্য গঙ্গা সমভূমি | সাম্রাজ্যের রাজধানী |
| তক্ষশিলা | উত্তর-পশ্চিম | বাণিজ্যপথ, সীমান্ত ও প্রাদেশিক শাসন |
| উজ্জয়িনী | পশ্চিম-মধ্য ভারত | উত্তর–দক্ষিণ ও পশ্চিম বাণিজ্যপথের সংযোগ |
| তোসালি | কলিঙ্গ অঞ্চল | পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসন |
| সুবর্ণগিরি | দক্ষিণাঞ্চল | খনিজসম্পদ ও দক্ষিণের প্রাদেশিক কেন্দ্র |
এই কেন্দ্রগুলির পরিচয় শিলালিপি ও অন্যান্য প্রমাণ থেকে পুনর্গঠিত। প্রতিটি প্রদেশে একই প্রশাসনিক কাঠামো ছিল—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। দূরত্ব, ভাষা, ভূপ্রকৃতি ও স্থানীয় শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শাসন ভিন্ন হতে পারে।
প্রশাসনের স্তর
পাটলিপুত্রে সম্রাট ও উচ্চপদস্থ কর্মচারী থাকতেন। প্রদেশে রাজপরিবারের সদস্য বা কুমার দায়িত্ব পেতে পারেন। শিলালিপিতে মহামাত্র, রাজুক, প্রাদেশিক ও যুক্ত-র মতো কর্মচারীর উল্লেখ আছে।
- মহামাত্র: বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সামাজিক দায়িত্বের উচ্চ কর্মচারী
- রাজুক: গ্রামীণ এলাকা, বিচার বা ভূমিসংক্রান্ত কাজে যুক্ত কর্মকর্তা
- প্রাদেশিক: অঞ্চল পরিদর্শন ও প্রশাসনিক তদারকির সঙ্গে যুক্ত
- যুক্ত: হিসাব বা কার্যনির্বাহী কাজের কর্মচারী
একই উপাধির কাজ সময় ও অঞ্চলে বদলাতে পারে। পরবর্তী গ্রন্থের প্রশাসনিক তালিকা সরাসরি অশোকের দপ্তরের পূর্ণ নকশা নয়।
রাজস্ব ও অর্থনীতি
বৃহৎ প্রশাসন, সৈন্য, সড়ক ও জনকল্যাণমূলক কাজ চালাতে রাজস্ব দরকার ছিল। কৃষিজ উৎপাদনের অংশ, বাণিজ্যশুল্ক, খনি, বন, লবণ বা বিভিন্ন পেশা থেকে আয় আসতে পারে। জমি ও ফসলের হিসাব, মাপ–ওজন এবং বাজার তদারকির উল্লেখ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আগ্রহ দেখায়।
তবে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র প্রতিটি ক্ষেত ও বাজার প্রতিদিন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত। স্থানীয় রীতি, মধ্যস্থ ব্যক্তি ও গ্রামীণ সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল। রাজস্বের দাবি অঞ্চল, ফসল ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অনুযায়ী বদলাতে পারে।
কৃষি (Agriculture), নগর ও বাণিজ্য
মধ্য গঙ্গা সমভূমির উর্বর জমি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রকে খাদ্য ও রাজস্ব দিত। সেচ, কূপ, বাঁধ ও জলাশয়ের দেখভালের উল্লেখ আছে; সুদর্শন হ্রদের নির্মাণ–মেরামতের ইতিহাস পশ্চিম ভারতের জলব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা দেখায়, যদিও তার বিবরণ বিভিন্ন যুগের শিলালিপিতে পাওয়া যায়।
পাটলিপুত্র, তক্ষশিলা, উজ্জয়িনী ও অন্যান্য নগর প্রশাসন, কারুশিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র। উত্তরাপথ ও দক্ষিণাপথের মতো দীর্ঘ সড়ক ও নদীপথ মানুষ, পণ্য, সৈন্য ও সংবাদ বহন করত। আঘাতচিহ্নিত মুদ্রা বিনিময়ে ব্যবহৃত হলেও শস্য, পণ্য ও শ্রমে লেনদেনও চলত।
সামরিক সংগঠন
গ্রিক বিবরণে মৌর্যদের বৃহৎ পদাতিক, অশ্বারোহী, রথ ও হাতিবাহিনীর কথা আছে। সংখ্যাগুলি অতিরঞ্জিত হতে পারে, কিন্তু বৃহৎ সাম্রাজ্যের জন্য সৈন্য, দুর্গ, অস্ত্র, পরিবহণ (Transport), খাদ্য ও পশুর সংগঠন জরুরি ছিল।
মেগাস্থিনিসের উদ্ধৃতিতে সামরিক কাজের জন্য কমিটির কথা বলা হয়েছে। অর্থশাস্ত্রের আদর্শ সেনাবাহিনী এবং মেগাস্থিনিসের বর্ণনা মিলিয়ে সম্ভাব্য কাঠামো বোঝা যায়, সম্পূর্ণ নিশ্চিত সংগঠন নয়।
অশোকের সিংহাসনারোহণ
বিন্দুসারের পরে উত্তরাধিকারসংঘর্ষের কাহিনি পরবর্তী বৌদ্ধ গ্রন্থে আছে। অশোক আনুমানিক 268 খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ অভিষিক্ত হন বলে সাধারণভাবে ধরা হয়। শিলালিপিতে তিনি নিজের ব্যক্তিনাম খুব কম ব্যবহার করেন; “দেবানংপিয় পিয়দসি”—দেবতাদের প্রিয়, প্রিয়দর্শী—উপাধি বেশি দেখা যায়।
পরে মাস্কি ও গুজরা প্রভৃতি শিলালিপিতে “অশোক” নামের সঙ্গে উপাধির যোগ পাওয়া যাওয়ায় পিয়দসি-কে ঐতিহাসিক অশোক হিসেবে শনাক্ত করা শক্তিশালী হয়। এটি শিলালিপি তুলনা করে পরিচয় নির্ধারণের সুন্দর উদাহরণ।
কলিঙ্গ যুদ্ধ
অশোকের অভিষেকের অষ্টম বছরে, আনুমানিক 261 খ্রিস্টপূর্ব-তে কলিঙ্গ যুদ্ধ ঘটে। বর্তমান ওডিশার উপকূলীয় অঞ্চল বাণিজ্য ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ত্রয়োদশ প্রধান শিলালিপিতে অশোক বলেন, বহু মানুষ নিহত, বন্দি ও স্থানচ্যুত হওয়ায় তিনি গভীর অনুতাপ অনুভব করেন।
এই দলিল বিশেষ কারণ বিজয়ী শাসক নিজের বিজয়ের মানবিক ক্ষতি স্বীকার করেছেন। কিন্তু অনুতাপের পর অশোক সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী তুলে দেন বা সাম্রাজ্য বিলুপ্ত করেননি। তিনি “ধম্মবিজয়”—নৈতিক প্রভাবের বিজয়—কে শ্রেষ্ঠ বলেন, আবার সীমান্তবাসীকে প্রয়োজনে শাস্তি (Punishment) দেওয়ার ক্ষমতার কথাও জানান। নৈতিক ঘোষণা ও রাষ্ট্রশক্তির এই টানাপোড়েন বুঝতে হবে।
ধম্ম কী
অশোকের ধম্ম কোনো নতুন ধর্ম বা শুধু বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্বের আরেক নাম নয়। এটি সাধারণ নৈতিক ও সামাজিক আচারের একটি কর্মসূচি:
- পিতা–মাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠের প্রতি সম্মান
- দাস–ভৃত্য ও নির্ভরশীল মানুষের প্রতি সদাচরণ
- ব্রাহ্মণ, শ্রামণ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান
- প্রাণিহত্যা ও অপ্রয়োজনীয় আচার কমানো
- সত্য, সংযম, দয়া ও কম ব্যয়
- ধর্মীয় সহনশীলতা
- মানুষের ও পশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা
- কূপ খনন, বৃক্ষরোপণ ও পথিকের সুবিধা
ধম্ম ব্যক্তিগত নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সাম্রাজ্যের সামাজিক শান্তিকে যুক্ত করে। এটি জাতিভিত্তিক অসমতা বিলুপ্তির পূর্ণ কর্মসূচি ছিল না এবং আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার হুবহু সমানও নয়।
ধম্মমহামাত্র ও পরিদর্শন
অশোক অভিষেকের ত্রয়োদশ বছরে ধম্মমহামাত্র নামে বিশেষ কর্মচারী নিয়োগের কথা জানান। তাঁরা বিভিন্ন সম্প্রদায়, নারী, সীমান্তবাসী, বন্দি ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের বিষয়ে নজর রাখতেন বলে শিলালিপিতে দাবি করা হয়েছে।
অন্য কর্মচারীদেরও নির্দিষ্ট সময়ে পরিদর্শনে গিয়ে প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে ধম্ম প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়। সম্রাট নিজেকে সর্বদা প্রজার কাজ শুনতে প্রস্তুত বলে উপস্থাপন করেন। এটি আদর্শ রাজত্বের ভাষা; বাস্তবে কত দ্রুত অভিযোগ পৌঁছত, তা আলাদা প্রশ্ন।
ধর্মীয় সহনশীলতা
দ্বাদশ প্রধান শিলালিপিতে নিজের সম্প্রদায়কে সম্মান করতে গিয়ে অন্য সম্প্রদায়কে নিন্দা না করার কথা বলা হয়েছে। অন্যের শিক্ষা শুনলে নিজের সম্প্রদায়ও উন্নত হয়—এই যুক্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
সহনশীলতা মানে সব মত একই বা কোনো বিতর্ক হবে না নয়। অশোক বাকসংযম, পারস্পরিক শ্রবণ ও সম্মান চান। বৃহৎ বহু-ধর্মীয় সাম্রাজ্যে এই নীতি সামাজিক সংঘাত কমানোর প্রশাসনিক উদ্দেশ্যও পূরণ করতে পারে।
প্রাণী ও পরিবেশসংক্রান্ত ব্যবস্থা
অশোক কিছু প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ বা সীমিত করেন, রাজকীয় রান্নাঘরে প্রাণীহত্যা কমানোর কথা বলেন এবং কিছু দিনে মাছ ধরা বা পশুর ওপর নির্দিষ্ট কাজ বন্ধ রাখেন। মানুষের ও পশুর জন্য চিকিৎসা, ঔষধি উদ্ভিদ, রাস্তার পাশে গাছ ও কূপের কথাও আছে।
এগুলিকে আধুনিক বন্যপ্রাণী আইন বা পরিবেশনীতি-এর সম্পূর্ণ সমতুল্য বলা যাবে না। তবু রাষ্ট্রের নৈতিক দায়, প্রাণীর কল্যাণ ও জনসুবিধা সম্পর্কে প্রাচীন রাজকীয় ঘোষণার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
অশোকের শিলালিপির ধরন
| ধরন | অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য | প্রধান বিষয় |
|---|---|---|
| প্রধান শিলালিপি | বড় শিলায় দীর্ঘ ঘোষণা | ধম্ম, কলিঙ্গ, ধর্মীয় সহনশীলতা, প্রশাসন |
| অপ্রধান শিলালিপি | বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ঘোষণা | অশোকের ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলন ও নির্দেশ |
| প্রধান স্তম্ভলিপি | পালিশ করা বেলেপাথরের স্তম্ভ | ধম্ম, বিচার, কর্মচারী ও প্রাণীসংরক্ষণ |
| অপ্রধান স্তম্ভলিপি | নির্দিষ্ট পবিত্র স্থান বা সংঘসংক্রান্ত | তীর্থ, দান ও সংঘের শৃঙ্খলা |
| পৃথক কলিঙ্গ শিলালিপি | ধৌলি ও জৌগড় | সদ্যজয়ী অঞ্চলের প্রশাসন ও মানবিক আচারের নির্দেশ |
সব শিলালিপি সব স্থানে একই নয়। শ্রোতা, অঞ্চল ও প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী বার্তা নির্বাচন করা হয়েছে। এটি সাম্রাজ্যিক যোগাযোগের পরিকল্পিত প্রকৃতি দেখায়।
ভাষা ও লিপির ছক
| অঞ্চল | প্রধান ভাষা | প্রধান লিপি |
|---|---|---|
| উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল | প্রাকৃত | ব্রাহ্মী |
| উত্তর-পশ্চিম | প্রাকৃত | খরোষ্ঠী |
| আফগানিস্তানের কিছু স্থান | গ্রিক ও আরামাইক | গ্রিক ও আরামাইক লিপি |
অশোক সাধারণ মানুষের বোধগম্য আঞ্চলিক ভাষার রূপ ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। একই বার্তা এক ভাষায় চাপিয়ে না দিয়ে স্থানীয় ভাষা–লিপির ব্যবহার সাম্রাজ্যের বৈচিত্র্য স্বীকার করে। সংস্কৃত অশোকের প্রধান শিলালিপির ভাষা ছিল—এ ধারণা ভুল।
ব্রাহ্মী লিপির পাঠোদ্ধার
শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্রাহ্মী লিপি পড়া যায়নি। উনিশ শতকে মুদ্রা ও শিলালিপির চিহ্ন তুলনা করে জেমস প্রিন্সেপ 1837 সালে ব্রাহ্মী পাঠোদ্ধারে বড় সাফল্য পান। বারবার দেখা “দেবানংপিয় পিয়দসি” উপাধি পড়া সম্ভব হয়। পরে অন্যান্য শিলালিপি ও সাহিত্যিক বংশতালিকার সঙ্গে মিলিয়ে অশোককে শনাক্ত করা হয়।
পাঠোদ্ধার একজনের আকস্মিক অনুমান ছিল না; বহু গবেষকের প্রতিলিপি, মুদ্রা অধ্যয়ন, ভাষাতাত্ত্বিক তুলনা ও সংশোধনের সমষ্টি। এটি প্রমাণ করে ইতিহাসে জ্ঞান সহযোগী ও সংশোধনযোগ্য।
স্তম্ভ ও শিল্প
মৌর্য স্তম্ভ একখণ্ড বেলেপাথরে তৈরি, অত্যন্ত মসৃণ পালিশযুক্ত এবং দূরবর্তী খনি থেকে আনা। স্তম্ভের ঘণ্টাকৃতি ভিত্তি, পশুমূর্তির শীর্ষাংশ ও সূক্ষ্ম খোদাই উচ্চ কারুশিল্পের দক্ষতা ও রাষ্ট্রের সম্পদ সংগঠনের ক্ষমতা দেখায়।
সারনাথের চার সিংহের শীর্ষাংশে পিঠ-লাগানো সিংহ, নিচে হাতি, ঘোড়া, ষাঁড় ও সিংহ এবং ধর্মচক্রের নকশা রয়েছে। সব শীর্ষাংশ একই নয়; রামপুরভার ষাঁড়, লৌরিয়া নন্দনগড়ের সিংহ প্রভৃতি আঞ্চলিক উদাহরণ আছে।
বরাবর পাহাড় গুহার পালিশ করা শৈলকর্তিত কক্ষ আজীবিকদের দানের সঙ্গে যুক্ত। এটি দেখায় অশোক ও তাঁর উত্তরসূরী শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কেই স্থাপত্যদান করেছিলেন—এমন নয়।
বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে অশোকের সম্পর্ক
অপ্রধান শিলালিপিতে অশোক নিজেকে বৌদ্ধ উপাসক হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং সংঘের প্রতি আগ্রহ দেখান। পরবর্তী বৌদ্ধ গ্রন্থে তৃতীয় ধর্মসভা, স্তূপ নির্মাণ এবং মহিন্দ–সংঘমিত্তার শ্রীলঙ্কা যাত্রার কাহিনি আছে। এগুলি বৌদ্ধধর্মের স্মৃতি ও বিস্তার বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সব ঘটনার সমকালীন শিলালিপিগত প্রমাণ সমান নয়।
অশোকের ব্যক্তিগত বৌদ্ধ আনুগত্য এবং সকল প্রজার জন্য প্রচারিত ধম্ম আলাদা স্তর। ধম্মকে পুরোপুরি বৌদ্ধধর্ম বললে তার বহুসাম্প্রদায়িক প্রশাসনিক ভাষা বোঝা যায় না।
মৌর্য সাম্রাজ্যের অবসান
অশোকের মৃত্যুর পরে সাম্রাজ্য দ্রুত ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়। আনুমানিক 185 খ্রিস্টপূর্ব-তে শেষ মৌর্য শাসক বৃহদ্রথকে তাঁর সেনাপতি পুষ্যমিত্র হত্যা করেন এবং শুঙ্গ শাসনের সূচনা হয়।
সম্ভাব্য কারণ:
- বিশাল ভূখণ্ডে যোগাযোগ (Communication) ও প্রশাসনের অসুবিধা
- উত্তরাধিকারীদের দুর্বলতা বা সংঘর্ষ
- প্রদেশে স্থানীয় শক্তির বৃদ্ধি
- সেনাবাহিনী ও প্রশাসন চালানোর আর্থিক চাপ
- উত্তর-পশ্চিমে নতুন রাজনৈতিক চাপ
- কেন্দ্রের সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চলের দুর্বল সংযোগ
“অশোকের অহিংসায় সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে সাম্রাজ্য পতন”—এই একক ব্যাখ্যার যথেষ্ট প্রমাণ নেই। অশোক সম্পূর্ণ সামরিক শক্তি ত্যাগ করেননি, এবং তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পরে পতন ঘটে। বহু কারণ ও আঞ্চলিক প্রক্রিয়া মিলিয়ে পরিবর্তন বুঝতে হয়।
মৌর্য শাসনের স্থায়ী গুরুত্ব
- উপমহাদেশের বিস্তৃত অঞ্চলে প্রথম বৃহৎ সাম্রাজ্যিক সংযোগ
- শিলালিপির মাধ্যমে সরাসরি রাজকীয় যোগাযোগ
- বহু ভাষা ও লিপিতে প্রশাসনিক বার্তা
- নৈতিক শাসন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও জনকল্যাণের ঘোষণা
- প্রদেশ, কর্মচারী ও পথভিত্তিক বৃহৎ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা
- পালিশ করা স্তম্ভ, গুহা ও পাথরশিল্পের উচ্চ মান
- পরবর্তী যুগে আদর্শ রাজা হিসেবে অশোকের পুনঃস্মরণ
এই গুরুত্ব স্বীকার করেও সাম্রাজ্যকে নিখুঁত কল্যাণরাষ্ট্র বলা যাবে না। সামরিক জয়, করব্যবস্থা, শাস্তি ও স্তরবিন্যাস তার অংশ ছিল। ইতিহাসে সাফল্য ও সীমা একসঙ্গে বিচার করা দরকার।
মূল পরিভাষা
- সাম্রাজ্য
- প্রদেশ
- মহামাত্র
- রাজুক
- শিলালিপি
- ধম্ম ও ধম্মবিজয়
- ধর্মীয় সহনশীলতা
- ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী
- প্রধান শিলালিপি
- স্তম্ভলিপি
- পৃষ্ঠপোষকতা
- সাম্রাজ্যিক সংহতি
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
07. প্রথম সাম্রাজ্য — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic