প্রারম্ভিক রাষ্ট্রসমূহ
জন থেকে জনপদ, ষোলো মহাজনপদ, রাজতন্ত্র ও গণ–সংঘ, মগধের উত্থান, কর, army, নগর, coin ও সামাজিক পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ বাংলা আলোচনা।
Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team
প্রারম্ভিক রাষ্ট্রসমূহ
হরপ্পার বড় নগরগুলির অবক্ষয়ের বহু শতাব্দী পরে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন কৃষিবসতি, জনপদ, নগর, বাণিজ্যপথ ও রাজনৈতিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। আনুমানিক প্রথম সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্ব-তে গোত্রভিত্তিক জনগোষ্ঠী থেকে ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্রের বিকাশ এই ইতিহাসের মূল বিষয়। এই পরিবর্তনও একরৈখিক ছিল না—রাজতন্ত্র (Monarchy), গোষ্ঠীশাসন, ছোট জনপদ ও শক্তিশালী মহাজনপদ (Mahajanapada) পাশাপাশি ছিল।
ইতিহাসের উৎস
প্রারম্ভিক রাষ্ট্রের ইতিহাস জানতে নানা উৎস মিলিয়ে দেখা হয়:
- বৈদিক সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ
- বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্য
- মহাকাব্য ও পরবর্তী ধর্মশাস্ত্র
- বসতি, দুর্গপ্রাচীর, মৃৎপাত্র, লোহার সরঞ্জাম ও সমাধি
- আঘাতচিহ্নিত মুদ্রা
- নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্রের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ
এই রচনাগুলি একই সময়ে লেখা নয় এবং তাদের ধর্মীয়, নৈতিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। কোনো গ্রন্থের আদর্শকে পুরো সমাজের সরাসরি বর্ণনা ধরা যায় না। প্রত্নতত্ত্ব (Archaeology) বস্তুগত জীবন দেখায়, কিন্তু মানুষের সব ধারণা বা পরিচয় সরাসরি বলে না। তাই পারস্পরিক সমর্থন জরুরি।
জন থেকে জনপদ
“জন” শব্দটি মানুষ বা জনগোষ্ঠী বোঝাত। “জনপদ” আক্ষরিকভাবে সেই জনের পা রাখা বা বসবাসের ভূখণ্ড—অর্থাৎ একটি অপেক্ষাকৃত স্থায়ী ভূখণ্ডভিত্তিক একক। পশুচারণ ও আত্মীয়তাভিত্তিক গোষ্ঠীর পাশাপাশি কৃষি (Agriculture), বসতি ও ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়লে রাজনৈতিক পরিচয় নির্দিষ্ট অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।
জনপদের নাম কখনও শাসকগোষ্ঠী বা মানুষের নামে—কুরু, পাঞ্চাল, মৎস্য, কোশল ইত্যাদি। একই নাম মানুষ, অঞ্চল ও রাজনৈতিক শক্তি—তিন অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে।
বৈদিক সমাজের পরিবর্তন
প্রারম্ভিক বৈদিক রচনায় গবাদি পশু, পশুচারণ, যুদ্ধ ও গোষ্ঠীর গুরুত্ব বেশি। পরবর্তী বৈদিক সময়ে গঙ্গা–যমুনা অববাহিকায় কৃষিবসতির বিস্তার, লোহার ব্যবহার, বড় আচার, রাজশক্তির দাবি এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রমাণ বাড়ে। কিন্তু পশুপালক জীবন অদৃশ্য হয়নি এবং সব অঞ্চল একই গতিতে বদলায়নি।
রাজা প্রথমে সর্বময় ভূখণ্ডের রাজা না হয়ে জনগোষ্ঠীর প্রধান হতে পারেন। সভা ও সমিতি নামে সমাবেশের উল্লেখ পাওয়া যায়; তাদের সদস্য, ক্ষমতা ও সময়ভেদে ভূমিকা নিয়ে গবেষণায় মতভেদ আছে। পরে রাজপদ অধিক বংশানুক্রমিক এবং প্রশাসনিক হয়ে ওঠে।
অশ্বমেধ ও রাজনৈতিক দাবি
অশ্বমেধ ছিল একটি বড় রাজকীয় যজ্ঞ। একটি ঘোড়া রক্ষীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরত; অন্য শাসক তাকে আটকালে সংঘর্ষ হতে পারত, আর যেতে দিলে আয়োজক রাজার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকারের প্রতীক ধরা হত। শেষে বড় আচার সম্পন্ন হত।
এটি আধুনিক মানচিত্রে স্থায়ী সাম্রাজ্যিক সীমানা প্রমাণ করে না। আচারভিত্তিক দাবি, সামরিক ক্ষমতা, করদ সম্পর্ক এবং বাস্তব দৈনন্দিন প্রশাসন আলাদা বিষয়। যজ্ঞে বিপুল সম্পদ ও পুরোহিতের অংশগ্রহণ রাজশক্তি ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের যোগ দেখায়।
লোহা, কৃষি ও বসতি
প্রথম সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্ব-তে বহু অঞ্চলে লোহার সরঞ্জাম-এর ব্যবহার বাড়ে। লোহার কুঠার বন পরিষ্কার এবং লাঙলের ফলা কঠিন মাটিতে চাষে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু “লোহা একাই গঙ্গা সমভূমিতে রাষ্ট্র তৈরি করল”—এমন প্রযুক্তিনির্ধারণবাদ ভুল। মাটি, বৃষ্টি, শ্রম, বীজ, পশুশক্তি, সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দাবি মিলিয়ে পরিবর্তন ঘটেছিল।
ধানের চারা রোপণ-এর মতো নিবিড় পদ্ধতিতে ফলন বাড়তে পারে, কিন্তু এতে বেশি শ্রম লাগে। উদ্বৃত্ত উৎপাদন শাসক, সৈন্য, কারিগর ও নগরবাসীকে খাদ্য জোগাতে পারে। আবার উদ্বৃত্ত সংগ্রহের ক্ষমতা কৃষকের ওপর কর ও বাধ্যবাধকতা বাড়াতে পারে।
মহাজনপদ
আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্ব-তে কিছু জনপদ বৃহৎ ও শক্তিশালী হয়ে “মহাজনপদ” নামে পরিচিত হয়। পরবর্তী সাহিত্যিক তালিকায় সাধারণত ষোলোটি মহাজনপদের উল্লেখ আছে:
অঙ্গ, মগধ, কাশী, কোশল, বৎস, অবন্তি, চেদি, কুরু, পাঞ্চাল, মৎস্য, শূরসেন, অশ্মক বা অস্সক, গান্ধার, কম্বোজ, বজ্জি এবং মল্ল। তালিকা ও বানানে উৎসভেদে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
সব মহাজনপদ সমান শক্তিশালী ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীর মধ্যে রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, কৌশাম্বী, উজ্জয়িনী, তক্ষশিলা ও বৈশালী উল্লেখযোগ্য। রাজধানী রাজনৈতিক ক্ষমতা, কারুশিল্প, বাজার ও পথ-এর কেন্দ্র হতে পারত।
দুর্গবেষ্টিত রাজধানী
বহু মহাজনপদের রাজধানী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। দুর্গবেষ্টনী আক্রমণ প্রতিরোধ, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, মর্যাদা প্রদর্শন এবং মানুষ–সম্পদ সংগঠনের কাজ করতে পারে। বিশাল প্রাচীর নির্মাণে পাথর/ইট, শ্রম, পরিবহণ (Transport) ও পরিকল্পনা দরকার—এটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রমাণ।
তবে প্রাচীর থাকলেই ক্রমাগত যুদ্ধ চলছিল এমন নয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পশু বা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতীকী সীমানা-ও ভূমিকা নিতে পারে। প্রাচীরের স্তর, প্রবেশদ্বার, মেরামত ও চারপাশের বসতি দেখে কাজ বিচার করা হয়।
রাজতন্ত্র ও গণ–সংঘ
অধিকাংশ মহাজনপদে রাজা বা বংশানুক্রমিক রাজশক্তি ছিল। মগধ, কোশল, বৎস ও অবন্তি রাজতান্ত্রিক শক্তির উদাহরণ। অন্যদিকে বজ্জি ও মল্লের মতো কিছু রাষ্ট্রকে গণ বা সংঘ বলা হয়। সেখানে বহু রাজা বা প্রধান একটি সভা-তে সিদ্ধান্ত নিতেন।
এই ব্যবস্থা আধুনিক সর্বজনীন গণতন্ত্র ছিল না। নারী, শ্রমজীবী, দাস বা সব সাধারণ মানুষের সমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রমাণ নেই। “গণসংঘ” অনুবাদটি সীমিত অর্থে ব্যবহার করা উচিত—এগুলি মূলত ক্ষত্রিয় গোষ্ঠী-এর সীমিত গোষ্ঠীশাসিত সভা হতে পারে।
বজ্জি সংঘে লিচ্ছবি সহ একাধিক গোষ্ঠী যুক্ত ছিল এবং বৈশালী গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সভা, আলোচনা ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হলেও ক্ষমতার সামাজিক ভিত্তি সীমিত ছিল।
মগধের উত্থান
ষষ্ঠ থেকে চতুর্থ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্ব-তে মগধ ক্রমে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তার উত্থানের সম্ভাব্য সুবিধা:
- গঙ্গা, সোন ও অন্যান্য নদীপথে যাতায়াত ও বাণিজ্য
- উর্বর পলিমাটি ও ধান উৎপাদনের সুযোগ
- কাছাকাছি অঞ্চলে লৌহ আকরিক-এর প্রাপ্যতা
- বনাঞ্চল ও হাতি—যুদ্ধ ও পরিবহণ-এ ব্যবহার
- নদী ও পাহাড়ে সুরক্ষিত প্রথম রাজধানী রাজগৃহ
- পরবর্তী রাজধানী পাটলিপুত্রের কৌশলগত অবস্থান
- দক্ষ ও সম্প্রসারণবাদী শাসক
একটি কারণকে একমাত্র কারণ বলা যাবে না। প্রাকৃতিক উৎস সম্ভাবনা দেয়; তা ব্যবহার করতে শ্রম, সংগঠন, সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল দরকার।
বিম্বিসার ও অজাতশত্রু
হর্যঙ্ক বংশের বিম্বিসার বিবাহসম্পর্ক, কূটনীতি ও সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মগধের প্রভাব বাড়ান বলে সাহিত্যিক উৎসে জানা যায়। অঙ্গ দখল পূর্বের বাণিজ্যপথে সুবিধা দেয়। তাঁর পুত্র অজাতশত্রু কোশল ও বজ্জির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং পাটলিগ্রাম অঞ্চলে দুর্গবেষ্টনী-এর সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ আছে।
এই বিবরণ বহু পরে সংকলিত বৌদ্ধ ও জৈন রচনায় এসেছে; তাই ঘটনাক্রম ও উদ্দেশ্য বিচার করতে উৎসের রচনাকাল ও মতাদর্শ বিবেচনা করতে হয়। একই শাসককে ভিন্ন ধর্মীয় পরম্পরা ভিন্নভাবে স্মরণ করতে পারে।
নন্দ শক্তি
চতুর্থ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্ব-তে নন্দ বংশ, বিশেষত মহাপদ্ম নন্দের নাম বিস্তৃত বিজয় ও শক্তিশালী রাজকোষের সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তী গ্রিক ও ভারতীয় পরম্পরা নন্দদের বিশাল সেনাবাহিনী ও সম্পদের কথা বলে, কিন্তু সংখ্যাগুলি অতিরঞ্জিত হতে পারে। নন্দ প্রশাসন ও করব্যবস্থা পরবর্তী বৃহৎ সাম্রাজ্যের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হয়।
কর ও রাজস্ব
স্থায়ী সেনাবাহিনী, দুর্গ, সড়ক, কর্মকর্তা ও রাজকীয় আচার চালাতে নিয়মিত উৎস দরকার। কৃষি উৎপাদনের অংশকে ভাগ, উপহার বা কর বা উপহার-কে বলি, এবং বাণিজ্য বা পণ্যের ওপর শুল্ক বলা হতে পারে। বিভিন্ন উৎসে শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ বদলায়।
কৃষক, পশুপালক, কারুশিল্প ও বাণিজ্যে ভিন্নভাবে অবদান দিতে পারত—শস্য, পশু, পণ্য, অর্থ বা শ্রমে। কর সংগ্রহ সবসময় একইভাবে কার্যকর হত না; রাষ্ট্রের দাবি ও বাস্তব সংগ্রহ-এর মধ্যে ব্যবধান থাকতে পারে।
কর রাষ্ট্রের জনসাধারণের কাজ, প্রতিরক্ষা ও প্রশাসন চালাতে পারে, আবার অতিরিক্ত দাবি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ইতিহাসে রাজস্বকে শুধু শাসকের সম্পদ নয়, উৎপাদন ও ক্ষমতার সম্পর্ক হিসেবেও দেখা হয়।
স্থায়ী সৈন্যবাহিনী
প্রথম দিকের প্রধানরা প্রয়োজনে গোষ্ঠী যোদ্ধা ডাকতে পারতেন। বৃহৎ রাষ্ট্রে পদাতিক, রথ, অশ্বারোহী ও হাতিসহ তুলনামূলক স্থায়ী সেনাবাহিনী-এর গুরুত্ব বাড়ে। সৈন্যকে খাদ্য, অস্ত্র ও পারিশ্রমিক দিতে নিয়মিত রাজস্ব ও রসদব্যবস্থা প্রয়োজন।
হাতি বনাঞ্চলসম্পন্ন পূর্বভারতের একটি সামরিক সুবিধা হতে পারে। তবে যুদ্ধের ফল শুধু হাতি বা সেনাবাহিনী আকার নির্ধারণ করে না; ভূপ্রকৃতি, সরবরাহ, জোট, রোগ ও নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় নগরায়ণ (Urbanisation)
গঙ্গা সমভূমিতে আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্ব থেকে নগর, বাজার ও কারুশিল্প কেন্দ্র-এর বৃদ্ধি “দ্বিতীয় নগরায়ণ” নামে পরিচিত। “দ্বিতীয়” বলা হয় হরপ্পা নগরায়ণের বহু শতাব্দী পরে নতুন নগরপর্ব হওয়ায়। এই শহরগুলি হরপ্পার সরাসরি অনুলিপি ছিল না; তাদের রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রেক্ষিত ভিন্ন।
রাজগৃহ, পাটলিপুত্র, কৌশাম্বী, উজ্জয়িনী, শ্রাবস্তী, চম্পা ও তক্ষশিলা পথ, প্রশাসন ও বিনিময়-এর কেন্দ্র ছিল। নগর মানেই সবাই বাণিজ্যে বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী নয়; শ্রমিক, কারুশিল্প, পরিবহণকর্মী, পরিচারক ও দরিদ্র মানুষও শহর গড়ত।
কারিগর, শ্রেণি ও বণিক
কুমোর, তাঁতি, ধাতুশিল্পী, হাতির দাঁত কারিগর, ছুতোর ও অন্যান্য কারুশিল্প নগর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। “শ্রেণি” নামে কারুশিল্প বা বণিক গোষ্ঠী-এর উল্লেখ পরবর্তী সূত্রে পাওয়া যায়। তারা উৎপাদনের নিয়ম, প্রশিক্ষণ, মান, অর্থসংস্থান বা ধর্মীয় দান-এ ভূমিকা নিতে পারে। সব কারুশিল্প একইভাবে সংগঠিত ছিল—এমন নয়।
সমৃদ্ধ গৃহস্থকে গহপতি এবং ধনী বণিক বা অর্থদাতা-কে শ্রেষ্ঠী/সেঠি বলা হয়েছে কিছু বৌদ্ধ রচনায়।
মুদ্রা ও বিনিময়
ছাপাঙ্কিত মুদ্রা উপমহাদেশের প্রাচীন পরিচিত মুদ্রার অন্যতম। রুপো বা তামা-এর টুকরোতে বিভিন্ন প্রতীক ছাপ করা হত। এগুলি বাণিজ্য ও পরিশোধ সহজ করতে পারে, কিন্তু মুদ্রা আসার পর পণ্যবিনিময় বন্ধ হয়নি। শস্য, পশু, শ্রম ও ঋণ-ও বিনিময়ের অংশ ছিল।
মুদ্রা-এর প্রাপ্তিস্থান, ওজন, ধাতু ও মুদ্রাভাণ্ডার থেকে প্রচলন ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বোঝা যায়। একটি রাজ্যে পাওয়া মুদ্রা অবশ্যই সেই রাজাই তৈরি করেছে—এমন নয়; বাণিজ্যে মুদ্রা দূরে যেতে পারে।
মৃৎপাত্র ও বসতির প্রমাণ
উত্তর ভারতের বহু নগরস্থলে উত্তরের কৃষ্ণ মসৃণ মৃৎপাত্র নামে চকচকে উৎকৃষ্ট মৃৎপাত্র পাওয়া যায়, বিশেষত প্রথম সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্ব-এর মধ্যভাগ ও পরবর্তী সময়ে। এটি নগরকেন্দ্রিক ভোগ ও দক্ষ উৎপাদন-এর একটি সূচক, কিন্তু উত্তরের কৃষ্ণ মসৃণ মৃৎপাত্র পাওয়া মানেই সেই স্থান অবশ্যই রাজধানী—এমন নয়।
ধূসর চিত্রিত মৃৎপাত্র কিছু আগের বসতি ও গঙ্গা–যমুনা অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত।
সামাজিক স্তরবিন্যাস
পরবর্তী বৈদিক রচনায় সমাজকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—চার বর্ণ-তে সাজানোর আদর্শ দেখা যায়। কিন্তু আদর্শনির্দেশমূলক গ্রন্থ-এর এই প্রতিরূপ বাস্তব সমাজের সব পেশা, গোষ্ঠী, অঞ্চল ও সম্পর্ককে সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করে না। বর্ণ ছিল ভাবাদর্শগত শ্রেণিবিভাগ; বাস্তব সামাজিক পরিচয় আরও জটিল ও পরিবর্তনশীল।
নারী, দাস-কর্মকার বা শ্রমনির্ভর মানুষ, কারিগর, পশুপালক এবং বনবাসী গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা প্রভাবশালী গোষ্ঠী গ্রন্থ-এ সীমিতভাবে দেখা যায়। প্রত্নতত্ত্ব ও বিকল্প পরম্পরা ব্যবহার করে তাদের ইতিহাস পুনর্গঠন করতে হয়। রাষ্ট্রের বিস্তার কখনও কৃষিজমি বাড়ায়, আবার অরণ্য সম্প্রদায়-র উৎস ও স্বশাসন-তে চাপ ফেলতে পারে।
রাষ্ট্র গঠনের প্রধান উপাদান
প্রারম্ভিক রাষ্ট্রকে শুধু “রাজা আছে” দিয়ে চেনা যথেষ্ট নয়। সাধারণত দেখা হয়:
- নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও রাজধানী
- শাসক কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্তের প্রতিষ্ঠান
- রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা
- সেনাবাহিনী ও বলপ্রয়োগের সংগঠন
- দুর্গবেষ্টনী ও জনসাধারণের নির্মাণ
- কর্মকর্তা বা প্রশাসনিক যোগাযোগের জাল
- কৃষি, কারুশিল্প ও বাণিজ্য-এর সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক
- শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার আচার বা ভাবাদর্শ
সব রাষ্ট্রে এই বৈশিষ্ট্য সমান শক্তিশালী ছিল না। রাষ্ট্রগঠন একটি প্রক্রিয়া, স্থির তালিকা নয়।
মূল পরিভাষা
- জন ও জনপদ
- মহাজনপদ
- গণ–সংঘ
- রাজতন্ত্র
- অশ্বমেধ
- দুর্গবেষ্টন
- রাজস্ব
- আঘাতচিহ্নিত মুদ্রা
- দ্বিতীয় নগরায়ণ
- শ্রেণি
- গহপতি ও সেঠি
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
05. প্রারম্ভিক রাষ্ট্রসমূহ — MCQ Test
30 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic