১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী পরিবর্তন
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের কারণ, কেন্দ্র, নেতৃত্ব, বিস্তার, পরাজয় এবং কোম্পানি শাসনের অবসানের সারণি-সমৃদ্ধ বাংলা আলোচনা।
Published by: TET Sampan Editorial Team Reviewed by: Social Science Review Team
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী পরিবর্তন
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তম সশস্ত্র অভ্যুত্থান। এটি ব্যারাকপুর ও মিরাটের সেনাছাউনিতে অসন্তোষ থেকে শুরু হলেও দ্রুত দিল্লি, আওধ, রোহিলখণ্ড, বুন্দেলখণ্ড ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সিপাহিদের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত শাসক, তালুকদার, কৃষক, কারিগর এবং শহরের বহু মানুষ যুক্ত হন। অঞ্চলভেদে নেতৃত্ব, দাবি ও অংশগ্রহণ আলাদা ছিল; তাই ঘটনাটিকে একই সঙ্গে সিপাহি বিদ্রোহ, জনবিদ্রোহ এবং ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী বৃহৎ প্রতিরোধ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়।
বিদ্রোহের ধারাচিত্র
রাজনৈতিক সংযুক্তি + ভূমি ও রাজস্বের চাপ + সামাজিক–ধর্মীয় আশঙ্কা + সেনাবাহিনীতে বৈষম্য (Discrimination) → এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ বিতর্ক → মিরাটে বিদ্রোহ → দিল্লিতে সম্রাটের নামে সংগ্রাম → উত্তর ও মধ্য ভারতে বিস্তার → ব্রিটিশ পুনর্দখল → কোম্পানি শাসনের অবসান
প্রধান কারণগুলির শ্রেণিবিন্যাস
| ক্ষেত্র | অসন্তোষের উৎস |
|---|---|
| রাজনৈতিক | ল্যাপস নীতি, আওধ সংযুক্তি, দেশীয় রাজ্যের ক্ষমতা হ্রাস |
| অর্থনৈতিক | উচ্চ ভূমিরাজস্ব, ঋণ, কারুশিল্পের সংকট ও জীবিকা হারানো |
| সামাজিক | তালুকদার, দরবারি, সৈনিক ও কর্মচারীর স্থানচ্যুতি |
| ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক | ধর্মান্তর ও সামাজিক প্রথায় সরকারি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা |
| সামরিক | বেতন–ভাতা, পদোন্নতি, বিদেশযাত্রা ও বর্ণবৈষম্য |
| তাৎক্ষণিক | চর্বি মাখানো বলে প্রচারিত এনফিল্ড কার্তুজ |
কোম্পানির সম্প্রসারণ ও রাজনৈতিক ক্ষোভ
ডালহৌসির ল্যাপস নীতিতে দত্তক উত্তরাধিকার অস্বীকার করে সাতারা, ঝাঁসি ও নাগপুরসহ কয়েকটি রাজ্য সংযুক্ত করা হয়। 1856 সালে আওধ ল্যাপস নীতিতে নয়, ‘কুশাসন’-এর অভিযোগে দখল করা হয়। মুঘল সম্রাটের উপাধি ও মর্যাদা বিলোপের পরিকল্পনাও পুরোনো শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
| ঘটনা | সাল | প্রভাব |
|---|---|---|
| সাতারা সংযুক্তি | 1848 | ল্যাপস নীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ |
| পাঞ্জাব সংযুক্তি | 1849 | উত্তর-পশ্চিমে কোম্পানির বিস্তার |
| ঝাঁসি সংযুক্তি | 1854 | রানি লক্ষ্মীবাইয়ের উত্তরাধিকার দাবি অস্বীকৃত |
| নাগপুর সংযুক্তি | 1854 | বৃহৎ রাজ্য কোম্পানির হাতে যায় |
| আওধ সংযুক্তি | 1856 | নবাব, তালুকদার, সৈনিক ও দরবারি ক্ষুব্ধ |
আওধের বিশেষ গুরুত্ব
বাংলা সেনাবাহিনীর বহু সিপাহি আওধ ও আশপাশের উচ্চবর্ণ কৃষক পরিবার থেকে আসতেন। আওধ সংযুক্তির পরে তালুকদারের জমি বাজেয়াপ্ত, নতুন রাজস্ব বন্দোবস্ত এবং নবাবি দরবার ভেঙে যাওয়ায় সমাজের বহু স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সিপাহির পারিবারিক অসন্তোষ এবং গ্রামের ভূমি–রাজস্বসংক্রান্ত ক্ষোভ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়।
কৃষক, জমিদার ও কারিগরের অসন্তোষ
উচ্চ রাজস্ব ও সময়মতো খাজনা না দিলে জমি নিলাম কৃষক ও জমিদার উভয়কেই প্রভাবিত করত। মহাজনি ঋণ এবং আদালতের দলিল পুরোনো সম্পর্ক বদলে দেয়। ব্রিটিশ আমদানিকৃত পণ্যের প্রতিযোগিতা ও দরবারের অবসানে কিছু কারিগর, অস্ত্রনির্মাতা ও বিলাসপণ্য উৎপাদক বাজার হারান। তবে সব কৃষক, জমিদার বা বণিক বিদ্রোহে যোগ দেননি।
সিপাহিদের অভিযোগ
| অভিযোগ | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| বেতনবৈষম্য | ইউরোপীয় সৈনিকের তুলনায় কম বেতন ও সুবিধা |
| পদোন্নতি | উচ্চ সামরিক পদ প্রায় সম্পূর্ণ ইউরোপীয়দের জন্য সংরক্ষিত |
| ভাতা | দূরবর্তী অঞ্চলে কাজের অতিরিক্ত ভাতা কমানো বা বাতিল |
| বিদেশযাত্রা | সমুদ্রযাত্রায় জাতি হারানোর আশঙ্কা; 1856 সালের সাধারণ পরিষেবা নিয়োগ আইন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সিপাহিদের বিদেশে কাজ করতে বাধ্য করার সুযোগ দেয় |
| সামাজিক অপমান | ইউরোপীয় অফিসারের বর্ণবাদী আচরণ |
| কার্তুজ | ধর্মীয় বিশ্বাস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা |
1856 সালের সাধারণ পরিষেবা নিয়োগ আইন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সিপাহিকে প্রয়োজনে সমুদ্রপারের সেবায় পাঠানোর সুযোগ দেয়। পুরোনো সিপাহিদের ওপর আইনটি একইভাবে প্রযোজ্য না হলেও সামগ্রিক অবিশ্বাস বেড়ে যায়।
এনফিল্ড রাইফেল ও কার্তুজ
নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ ব্যবহারের আগে দাঁত দিয়ে মুখ ছিঁড়তে হত। কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহৃত হয়েছে—এই গুজব হিন্দু ও মুসলমান সিপাহিদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতের আশঙ্কা তৈরি করে। কোম্পানি ব্যাখ্যা ও বিকল্পের চেষ্টা করলেও বহুদিনের অসন্তোষের পরিবেশে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারেনি। কার্তুজ ছিল স্ফুলিঙ্গ; বিদ্রোহের একমাত্র কারণ নয়।
মঙ্গল পাণ্ডে ও ব্যারাকপুর
1857 সালের 29 মার্চ ব্যারাকপুরের 34তম বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আক্রমণ করেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করে 8 এপ্রিল ফাঁসি দেওয়া হয়। রেজিমেন্টটি পরে ভেঙে দেওয়া হয়। ব্যারাকপুরের ঘটনা ক্রমবর্ধমান সামরিক সংকটের প্রাথমিক প্রকাশ ছিল।
মিরাট থেকে দিল্লি
24 এপ্রিল মিরাটে 3য় লাইট ক্যাভালরির 90 জনের মধ্যে 85 জন কার্তুজ নিতে অস্বীকার করেন। 9 মে তাঁদের দণ্ড দেওয়া হয়। 10 মে সিপাহিরা বিদ্রোহ করে বন্দিদের মুক্ত করেন এবং পরদিন দিল্লিতে পৌঁছান। সেখানে শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বিদ্রোহের প্রতীকী নেতা ঘোষণা করা হয়।
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| 29 মার্চ 1857 | ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের ঘটনা |
| 8 এপ্রিল 1857 | মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি |
| 9 মে 1857 | মিরাটে 85 জন সিপাহির দণ্ড |
| 10 মে 1857 | মিরাটে প্রকাশ্য বিদ্রোহ |
| 11 মে 1857 | দিল্লিতে বিদ্রোহীদের প্রবেশ |
| সেপ্টেম্বর 1857 | ব্রিটিশ বাহিনীর দিল্লি পুনর্দখল |
| মার্চ 1858 | লক্ষ্ণৌ পুনর্দখল |
| জুন 1858 | গ্বালিয়রের কাছে রানি লক্ষ্মীবাইয়ের মৃত্যু |
| এপ্রিল 1859 | তান্তিয়া টোপের ফাঁসি |
বাহাদুর শাহ জাফরের ভূমিকা
বৃদ্ধ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের বাস্তব সামরিক ক্ষমতা সীমিত ছিল। তবু মুঘল সম্রাটের নাম বিভিন্ন অঞ্চল, ধর্ম ও শাসকগোষ্ঠীকে একটি পরিচিত বৈধতার প্রতীকের নিচে আনতে সাহায্য করে। তাঁর নামে ফরমান জারি ও মুদ্রা প্রচলনের চেষ্টা হয়। দিল্লি পুনর্দখলের পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে বিচার করা হয় এবং রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়; 1862 সালে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্র ও নেতৃত্ব
| কেন্দ্র | প্রধান নেতা | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| দিল্লি | বাহাদুর শাহ জাফর, বখত খান | প্রতীকী সাম্রাজ্যিক কেন্দ্র |
| কানপুর | নানাসাহেব, তান্তিয়া টোপে, আজিমুল্লাহ খান | পেশোয়ার পেনশন দাবি ও সামরিক প্রতিরোধ |
| লক্ষ্ণৌ ও আওধ | বেগম হজরত মহল, বিরজিস কদর, মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহ | তালুকদার, কৃষক ও প্রাক্তন সৈনিকের বিস্তৃত অংশগ্রহণ |
| ঝাঁসি | রানি লক্ষ্মীবাই | রাজ্যের অধিকার ও সশস্ত্র প্রতিরোধ |
| বিহার | কুনওয়ার সিং | জগদীশপুরের জমিদার ও গেরিলা যুদ্ধ |
| বেরিলি | খান বাহাদুর খান | রোহিলখণ্ডের নেতৃত্ব |
| ফৈজাবাদ | মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহ | আওধে ধর্মীয়–রাজনৈতিক নেতৃত্ব |
| গ্বালিয়র | রানি লক্ষ্মীবাই ও তান্তিয়া টোপে | 1858 সালের শেষ বড় সামরিক কেন্দ্রগুলির একটি |
নানাসাহেব ও কানপুর
শেষ পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তকপুত্র নানাসাহেবকে কোম্পানি পেনশন দিতে অস্বীকার করে। কানপুরে বিদ্রোহের সময় তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সহচর তান্তিয়া টোপে পরবর্তী পর্যায়ে মধ্য ভারতে দ্রুত চলমান গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন। 1859 সালে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে ধরা পড়ে তান্তিয়া টোপের ফাঁসি হয়।
রানি লক্ষ্মীবাই ও ঝাঁসি
ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের মৃত্যুর পরে তাঁর দত্তকপুত্র দামোদর রাওকে কোম্পানি উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকার করেনি। ল্যাপস নীতিতে ঝাঁসি সংযুক্ত হয়। 1857 সালে ঝাঁসিতে বিদ্রোহের পরে রানি লক্ষ্মীবাই প্রশাসন ও প্রতিরক্ষার নেতৃত্ব নেন। হিউ রোজের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে তিনি কালপী ও গ্বালিয়রে যান এবং 1858 সালের জুনে যুদ্ধে নিহত হন।
বেগম হজরত মহল ও আওধ
আওধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ নির্বাসিত হলে বেগম হজরত মহল লক্ষ্ণৌয়ে তাঁদের পুত্র বিরজিস কদরকে শাসক ঘোষণা করেন। তিনি তালুকদার, সৈনিক ও ধর্মীয় নেতাদের সমর্থন সংগঠিত করেন। লক্ষ্ণৌ পতনের পরেও প্রতিরোধ চালিয়ে শেষে নেপালে আশ্রয় নেন।
কুনওয়ার সিং
বিহারের জগদীশপুরের প্রবীণ জমিদার কুনওয়ার সিং দানাপুরের বিদ্রোহী সিপাহিদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরা, আজমগড় ও জগদীশপুর অঞ্চলে লড়াই করেন। প্রায় আশি বছর বয়সেও তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব বিদ্রোহের আঞ্চলিক শক্তি দেখায়। 1858 সালে জগদীশপুর পুনর্দখলের অল্প পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
বিদ্রোহের ভৌগোলিক বিস্তার
বিদ্রোহের প্রধান এলাকা ছিল উত্তর ও মধ্য ভারত—বিশেষত গঙ্গা–যমুনা দোয়াব, আওধ, রোহিলখণ্ড, বুন্দেলখণ্ড এবং মধ্য ভারতের অংশ। বাংলা, দক্ষিণ ভারত, পাঞ্জাবের বড় অংশ এবং বোম্বে–মাদ্রাজ সেনাবাহিনী তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকে। তাই এটি সর্বভারতীয় ভূখণ্ডে সমানভাবে বিস্তৃত ছিল না।
কারা কোম্পানিকে সহায়তা করেছিল
পাঞ্জাবের শিখ ও কিছু অন্যান্য সৈন্য, গুর্খা বাহিনী, হায়দরাবাদসহ বহু দেশীয় রাজ্য এবং কিছু জমিদার–বণিক ব্রিটিশদের সহায়তা করেন বা নিরপেক্ষ থাকেন। সিন্ধিয়া, হোলকর ও নিজামের মতো শাসকের আনুগত্য ব্রিটিশদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিদ্রোহীদের একক কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থা না থাকাও তাদের দুর্বল করে।
ব্রিটিশ দমন ও পুনর্দখল
ব্রিটেন, পাঞ্জাব ও অন্য অঞ্চল থেকে নতুন সৈন্য এনে ব্রিটিশরা দিল্লি, কানপুর ও লক্ষ্ণৌ পুনর্দখল করে। টেলিগ্রাফ দ্রুত সংবাদ পাঠাতে এবং রেল কিছু ক্ষেত্রে সেনা পরিবহনে সাহায্য করে। গ্রাম পোড়ানো, গণফাঁসি, কামানের মুখে দণ্ড এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তসহ অত্যন্ত নির্মম প্রতিশোধ নেওয়া হয়। বিদ্রোহী পক্ষেও ইউরোপীয় নারী–পুরুষ ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ঘটে।
বিদ্রোহের পরাজয়ের কারণ
| কারণ | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| সীমিত বিস্তার | দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম ভারতের বড় অংশ বাইরে ছিল |
| একক পরিকল্পনার অভাব | কেন্দ্রগুলির লক্ষ্য ও নেতৃত্ব পৃথক |
| অস্ত্র ও সরবরাহ | ব্রিটিশদের উন্নত অস্ত্র, অর্থ ও নিয়মিত রসদ |
| যোগাযোগ (Communication) | টেলিগ্রাফ ও নৌপথে ব্রিটিশ সমন্বয় দ্রুত |
| দেশীয় রাজ্যের ভূমিকা | বহু রাজা ব্রিটিশের পক্ষে বা নিরপেক্ষ |
| সামরিক সহায়তা | পাঞ্জাব, গুর্খা ও অন্যান্য বাহিনীর ব্যবহার |
| দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি | বিদ্রোহীদের সর্বসম্মত ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপরিকল্পনা ছিল না |
কোম্পানি শাসনের অবসান
1858 সালের ভারত শাসন আইন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটায়। ভারতের প্রশাসন ব্রিটিশ রাজমুকুটের হাতে যায়। লন্ডনে ভারতসচিব ও তাঁর পরিষদ তৈরি হয়; ভারতে গভর্নর-জেনারেল একই সঙ্গে ভাইসরয় নামে রাজমুকুটের প্রতিনিধি হন। লর্ড ক্যানিং প্রথম ভাইসরয় হিসেবে পরিচিত।
কোম্পানির পরিচালকমণ্ডলী → বিলুপ্ত প্রশাসনিক কর্তৃত্ব
ব্রিটিশ রাজমুকুট → ভারতসচিব ও পরিষদ → ভাইসরয় → প্রাদেশিক ও জেলা প্রশাসন
1858 সালের রানির ঘোষণা
1 নভেম্বর 1858 এলাহাবাদে লর্ড ক্যানিং রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণা পাঠ করেন। এতে দেশীয় রাজ্যের চুক্তি রক্ষা, ধর্মে অযথা হস্তক্ষেপ না করা, যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে প্রবেশ এবং নির্বিচার ভূখণ্ড সংযুক্তি বন্ধের প্রতিশ্রুতি ছিল। বাস্তবে বর্ণবৈষম্য ও ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব বহাল থাকে।
দেশীয় রাজ্যনীতি ও জমিদার
বিদ্রোহের পরে ব্রিটিশরা দেশীয় রাজাদের সাম্রাজ্যের সহযোগী হিসেবে রক্ষা করার নীতি গ্রহণ করে। দত্তক উত্তরাধিকার স্বীকৃত হয় এবং ল্যাপস নীতি পরিত্যক্ত হয়। আওধে অনুগত তালুকদারদের জমি ফিরিয়ে দিয়ে গ্রামীণ সমাজে তাদের মধ্যস্থতাকারী ক্ষমতা পুনর্গঠন করা হয়।
সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন
| পরিবর্তন | উদ্দেশ্য |
|---|---|
| ইউরোপীয় সৈন্যের অনুপাত (Ratio) বৃদ্ধি | ভারতীয় বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ |
| কামানবাহিনী ইউরোপীয়দের হাতে | বিদ্রোহের প্রধান সামরিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ |
| নিয়োগক্ষেত্র বদল | আওধ–বিহারের উচ্চবর্ণ সিপাহির ওপর নির্ভরতা কমানো |
| শিখ, গুর্খা ও পাঠান নিয়োগ বৃদ্ধি | তথাকথিত ‘যোদ্ধা জাতি’ তত্ত্বের প্রয়োগ |
| জাতি–ধর্মভিত্তিক রেজিমেন্ট | বৃহৎ ঐক্য গঠনের সম্ভাবনা কমানো |
‘যোদ্ধা জাতি’ তত্ত্ব
বিদ্রোহের পরে ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তারা কিছু জনগোষ্ঠীকে স্বভাবগতভাবে বিশ্বস্ত ও যোদ্ধা এবং অন্যদের অযোদ্ধা বলে শ্রেণিবদ্ধ করেন। এটি বৈজ্ঞানিক সত্য ছিল না; 1857-এ কারা ব্রিটিশদের সহায়তা করেছিল সেই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জাতিগত ধারণা এর ভিত্তি ছিল।
জাতি ও ধর্মভিত্তিক বিভাজন
বিদ্রোহের সময় হিন্দু–মুসলমান সহযোগিতা ব্রিটিশ প্রশাসনকে উদ্বিগ্ন করেছিল। পরবর্তী শাসনে জনগণনা, পৃথক সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনৈতিক হিসাব গুরুত্ব পায়। ‘ভাগ করে শাসন’ কোনো একক ঘোষিত নীতি না হলেও প্রশাসনিক চর্চায় জাতি, ধর্ম ও অঞ্চলভিত্তিক পার্থক্য ব্যবহার করা হয়।
ভূমি ও প্রশাসনিক নীতির পরিবর্তন
বিদ্রোহের পরে সরকার সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং জমিদার–রাজাদের সহযোগিতার দিকে ঝোঁকে। আইন প্রণয়নে ভারতীয় মতামতের সীমিত অংশগ্রহণের কথা বলা হয়। 1861 সালের ভারতীয় পরিষদ আইন আইন পরিষদে কিছু মনোনীত ভারতীয় সদস্য নেওয়ার সুযোগ দেয়, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের হাতেই থাকে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভিত্তিক পার্থক্য
| বিষয় | সঠিক তথ্য |
|---|---|
| বিদ্রোহের সূচনা | 10 মে মিরাটে বৃহৎ বিদ্রোহ; তার আগে ব্যারাকপুরসহ অসন্তোষ ছিল |
| মঙ্গল পাণ্ডে | 29 মার্চ ব্যারাকপুরের ঘটনা; 8 এপ্রিল 1857 ফাঁসি |
| কার্তুজ | তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ, একমাত্র কারণ নয় |
| আওধ | 1856 সালে কুশাসনের অভিযোগে সংযুক্ত; ল্যাপস নীতিতে নয় |
| বাহাদুর শাহ জাফর | প্রতীকী সম্রাট; বিদ্রোহের একক সামরিক পরিকল্পনাকারী নন |
| বিস্তার | উত্তর ও মধ্য ভারতে প্রধান; সমগ্র ভারতে সমান নয় |
| অংশগ্রহণ | শুধু সিপাহি নয়, আবার ভারতের সবাইও অংশ নেননি |
| রানি লক্ষ্মীবাই | ঝাঁসির নেতৃত্বের পরে কালপী ও গ্বালিয়রে যুদ্ধ করেন |
| শাসন হস্তান্তর | 1858 সালের আইনে কোম্পানি থেকে ব্রিটিশ রাজমুকুটের হাতে |
| লর্ড ক্যানিং | বিদ্রোহকালে গভর্নর-জেনারেল; পরে প্রথম ভাইসরয় |
| ল্যাপস নীতি | 1858-এর পরে পরিত্যক্ত; দেশীয় রাজাকে সহযোগী করা হয় |
| সেনা পুনর্গঠন | ইউরোপীয় অনুপাত ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ে; কামান প্রধানত তাদের হাতে থাকে |
PRACTICE QUIZ
Take a Test from This Topic
20. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী পরিবর্তন — MCQ Test
32 questions
OWNER QUIZ TOOL
Add a test to this topic
The quiz form will automatically select this topic and its primary category.
➕ Add a Quiz for This Topic